স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল

প্রবন্ধ-মতামত
শেয়ার করুন

  • তাপস হালদার

২৬ মার্চ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি হঠাৎ করে একদিনে আসেনি। কারো একটি ঘোষণা কিংবা ডাকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়নি। এর জন্য বাঙালি জাতিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২৪ টি বছর। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও বাঙালিদের মুক্ত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু তাঁরা সফল হননি। কিন্তু সফল হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন।

১৯৬৬ সাল রাজনীতির জন্য ছিল টার্নিং পয়েন্ট। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে বাঙালির মুক্তির সনদ ‘ছয়-দফা’কে সারা বাংলায় ছড়িয়ে দেন। ‘ছয়-দফা’র পক্ষে ব্যাপক জনমত তৈরী করেন। যার প্রতিফলন ঘটে ৭০ সালের নির্বাচনে। প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ টি এবং জাতীয় পরিষদে ১৬৯ টি আসনের মধ্যে ১৬৭ টি আসন পায় আওয়ামী লীগ।বাংলার অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

কিন্তু এত বিপুল বিজয়ের পরও পাকিস্তানী শাসক চক্র ক্ষমতা হস্তান্তরে  নাটক শুরু করে। ৩ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে পুরো বাংলা অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে। ৭ মার্চের ভাষণের পর পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ে। দেশ চলতে থাকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। এরপর ২৫ মার্চ পাকবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।ইংরেজীতে লেখা ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘This may be last message, from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to be last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved. (‘এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি।পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত  করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।’)

স্বাধীনতার এই ঘোষণা বাংলাদেশের সর্বত্র ওয়্যারলেস, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়া হয়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতা ঘোষণার পরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাত ১.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে সেনানিবাসে নিয়ে যায় এবং তিন দিন পর পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর ২৭ মার্চ বিশ্বের অন্তত ২৫ টি দেশের  প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে গুরুত্ব সহকারে শিরোনাম করে।ইংল্যান্ডের ‘দ্যা টাইমস’ Heavy Fighting as Sheikh Mujibur declares East Pakistan independent’ শিরোনামে লিখে, প্রাদেশিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে গৃহযুদ্ধের গর্জন। ‘দ্যা ফিনান্সিয়াল টাইমস’-এ  Civil War after East Pakistan declares independence  শিরোনামে বলা হয়, গতকাল শেখ মুজিবের স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক ‘দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ওই অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে বিদ্রোহের কয়েক ঘন্টা পর শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’ অস্ট্রেলিয়ার ‘দ্য এজ’ Dacca breaks with Pakistan’  শিরেনামে বলা হয়েছে, ‘আজ পূর্ব পাকিস্তান নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করেছে এবং শেখ মুজিব এই ঘোষণা দেন। ‘বার্তা সংস্থা এপি’র খবরে বলা হয়, ‘ইয়াহিয়ার পুনরায় মার্শাল ল ঘোষণা ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।’ দিল্লির স্টেটসম্যান পত্রিকার খবরে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে রহমানের পদক্ষেপ। একটি গোপন বেতার থেকে প্রচারিত ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের পূর্বাংশকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে নতুন নামকরণ করেছেন।’ এবং রেডিও পাকিস্তান থেকেও বলা হয়েছিল, স্বাধীনতার ঘোষণার কয়েক ঘন্টা পরই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

২৬ মার্চ থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হলেও এই যুদ্ধকে পরিচালনার জন্য একটি সরকার গঠনের দরকার ছিল।গণপরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা সেই সরকার গঠন করেন। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়। পুরো নয় মাস বঙ্গবন্ধুর নামেই মুক্তিযুদ্ধ হয়। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করায় ২৬ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক ভাষণে বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী ও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

পাকিস্তানের তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইয়ে লিখেছেন, ‘যখন প্রথম গুলিটি ছোড়া হল, ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তান রেডিওর সরকারি তরঙ্গের কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকে ক্ষীণস্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের কন্ঠস্বর ভেসে এল। ওই কন্ঠের বাণী মনে হল আগেই রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল। তাতে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।’

পাকিস্তান সরকার কিংবা তাদের দলিল দস্তাবেজ থেকে পাওয়া যায়, তারা একজন ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমানকেই পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর দ্বারা ১৫০ অনুচ্ছেদে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ও ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ অন্যান্য বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোনও পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য করা হয়েছে। এখনও কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালায়। এরা স্বাধীনতা বিরোধী,বাংলাদেশের শত্রু। যারা বাংলাদেশকে এখনও মেনে নিতে পারে না, তারাই বঙ্গবন্ধুকে হেয় করার চেষ্টা করে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা সংবিধান লংঘনের শামিল ও রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ।

লেখক: সদস্য,সম্প্রীতি বাংলাদেশ সাবেক ছাত্রনেতা।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.