স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতীক আওয়ামী লীগ

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • তাপস হালদার

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পরই বাঙালি জাতির ওপর বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু হয়। প্রথমেই মাতৃভাষার ওপর আঘাত আসে। পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ, বঞ্চনার প্রতিবাদে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল নেতাকর্মীরা একত্রিত হয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন গঠন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, আতাউর রহমান খান, শওকত হোসেন ও আলী আহমেদ খান সহ-সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক, কারাবন্দি তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা ও পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিসহ ২১ দফা দাবি নিয়ে বাংলার জনগণের কাছে ছুটে যায় দলটি। মার্চ মাসের সে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ২৩৭ আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি এবং মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন পায়। যুক্তফ্রন্টের শরিক আওয়ামী লীগ একাই ১৪৩টি আসন পাওয়ার পরেও কৃষক পার্টির এ কে ফজলুল হককে মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসানো হয়। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোপালগঞ্জ আসন থেকে নির্বাচিত হন এবং প্রাদেশিক সরকারের কৃষি, ঋণ, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যদিও এটি সরাসরি আওয়ামী লীগ দলের সরকার ছিল না।

১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ প্রথম সরকার গঠন করে। আতাউর রহমানের নেতৃত্বে সে সরকারের মেয়াদ ছিল মাত্র ২ বছর (১৯৫৬-৫৮)। মন্ত্রীসভায় বঙ্গবন্ধু শিল্প, বাণিজ্য, শ্রমসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু দলে আরো বেশি সময় দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৫৭ সালের ৩০ মে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেন। একই সময়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কেন্দ্রে কোয়ালিশন সরকার হিসেবে ১৩ মাস (১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬-১১ নভেম্বর ১৯৫৭) আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসনামলে মাত্র দুই বছর ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। এই সংক্ষিপ্ত সময়েও আতাউর রহমান সরকার বেশ কিছু ভালো কাজ করেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: মারাত্মক খাদ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করা, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি ঘোষণা, ভাষা শহীদ পরিবারকে আর্থিক অনুদান, ভূমিহীন কৃষকদের রিলিফ প্রদান, পহেলা বৈশাখকে বাংলা নববর্ষ ঘোষণা, ঢাকায় চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) স্থাপন।

স্বল্পতম সময়ে সোহরাওয়ার্দী সরকারও কেন্দ্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: পাকিস্তানের দুই প্রদেশের কাজে সমতা আনা, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন প্রথমবারের মতো ঢাকায় করা, যৌথ নির্বাচনী ব্যবস্থা আইন পাশকরণ, পাট বাজারজাতকরণ, পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন সংস্থা (ওয়াপদা) প্রতিষ্ঠা।

১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করে। কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে।আওয়ামী লীগের এই বিজয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলার অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বৈধ প্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ দেয়।

জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সদস্যগণ ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল কারাবন্দি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে প্রবাসী সরকার গঠন করেন। এই প্রবাসী সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে (১২ জানুয়ারী ১৯৭২ থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫) মাত্র সাড়ে তিন বছর সরকারে ছিল আওয়ামী লীগ। এ সময়ের মধ্যে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন গুলো হলো: সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মাত্র দশ মাসে একটি সংবিধান জাতিকে উপহার দেয়া, ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার, ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রিত প্রায় এক কোটি লোককে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা, বিশ্বের ১৪০টি দেশের স্বীকৃতি লাভ করা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ে।

দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।পাকিস্তান আমলের ২৪ বছর এবং বাংলাদেশের ২৫ বছরের মধ্যে সেই সরকারই প্রথমবাবের মতো তাদের মেয়াদ পূর্ণ করে। তখন সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। তা হলো: বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের বিচারের পথ সুগম করতে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব প্রবর্তন, সংসদকে শক্তিশালী করতে মন্ত্রীর পরিবর্তে সংসদ সদস্যদের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা, ভারতের সাথে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তি স্বাক্ষর, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সম্পাদন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মহিলাদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা, নারীর ক্ষমতায়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ, মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক অনুদান প্রদান এবং বাঙালির গৌরব ভাষা আন্দোলন (২১ ফেব্রুয়ারি,১৯৫২) ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন।

দ্বিতীয় দফায় দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে আওয়ামী লীগ।৩০০ আসনের মধ্যে ২৬২টি আসন পায় মহাজোট। আওয়ামী লীগ একাই ২৩০টি আসন লাভ করে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। তারপর থেকে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতায় এসেই অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করেন। জাতির পিতা হত্যাকান্ডের বিচার সম্পন্ন করা, ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর, ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভারত ও মায়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি, ভারতের সাথে দীর্ঘ ৬৮ বছরের পুরোনো স্থল সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করেন। এছাড়াও ডিজিটাল সেবাকে দেশের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিতকরণ, মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে বই বিতরণ, দারিদ্র্য হ্রাস, মাথাপিছু আয় দুই ডলারে উন্নীতকরণ, আশ্রয়ণ প্রকল্প, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্পসহ অনেক জনবান্ধব কাজ করেছে সরকার।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার তলাবিহীন ঝুঁড়ির তকমা ঘুচিয়ে, বিশ্বের বুকে এখন উন্নয়নের রোল মডেল।নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১।রূপপুরে নির্মাণ করা হচ্ছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আওয়ামী লীগ সরকার ভিশন-২০২১ বাস্তবায়ন করে, ভিশন-২০৪১ তথা উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের দিকে এগিয়ে চলেছে।

আওয়ামী লীগের ৭৩ বছরের ইতিহাসে দলটি ক্ষমতায় ছিল মাত্র ২৪ বছর।পাকিস্তানী শাসনামলে ২ বছর এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ২২ বছর। তারপরও যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে, তখনই জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করেছে। বাংলাদেশের সকল অর্জনের মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগের অবদান। স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় থাকবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

 

প্রকাশকাল: ২২ জুন ২০২২, সুখবর

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

 


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.