সম্প্রীতি ও বাংলাদেশ

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • মো. নাসির  উদ্দিন আহমেদ

এই ভূখন্ডে, বর্তমান বাংলাদেশে, হাজার বছর ধরে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ,খ্রিষ্টান, চাকমা, সাঁওতালসহ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এক সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করে আসছে বলেই সব স্রোত এক ধারায় এসে মিলিত হয়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী। আমাদের মুক্তিসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর অভূতপূর্ব বিজয় অর্জনে এককভাবে যে উপাদানটি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তা হলো বাঙালি সংস্কৃতির শক্তি। আর বাঙালি সংস্কৃতির মূল কথা হলো, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতি। বাংলার মাটি তার শ্যামল  বুকে চিরকাল সম্প্রীতিকে ধারণ করে এসেছে, পরির্চযা করেছে গভীর ভালোবাসায় । আমাদের হৃদয় চিরকালই সিক্ত সহর্মমিতা ও সম্প্রীতির অনিশেঃষ ধারায় । আমাদের শত বছরের ইতিহাস জাতি-র্ধম-র্বণ নির্বিশেষে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস, একের বিপদে অন্যকে উজার করে দেওয়ার নিরন্তর কাহিনী।

জাতির পতিা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির হৃদয় স্পর্শ করে বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব, উন্নতি, মর্যাদা এবং শক্তির অন্যতম অবলম্বন হবে বাঙালি সংস্কৃতিপ্রসূত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রনীতি। তাই তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মৌলিক আদর্শ হিসেবে সন্নিবেশিত করলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সংবিধানে সুনির্দিষ্ট ধারা যোগ করে রক্ষাকবচ তৈরি করলেন, যাতে বাংলাদেশে আর ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি কেউ করতে না পারে। বঙ্গবন্ধু কন্যা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তারই ধারাবাহিকতায়, জাতির পিতার আদর্শের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ধরে রাখতে সচেষ্ট। অথচ একটি চিহ্নিত অপশক্তি সব সময় এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার অপচেষ্টা করেছে।

বঙ্গবন্ধু আজীবন অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী ছিলেন। সর্ব ধর্মের সমন্বয় এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি ছিল এই জ্যোতির্ময় নেতার জীবনদর্শন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি এই জীবনদর্শন থেকে কখনোই বিচ্যুত হন নাই। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও সমান ভালোবাসা। মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান দেশের সর্বধর্মের মানুষেরও আছে মহান নেতার প্রতি রয়েছে অটুট আস্থা। ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুই বোধকরি সর্বপ্রথম স্পষ্ট করে বলেছিলেন ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। সকল মানুষের ধর্ম-কর্ম করার অধিকার থাকবে’। তবে তিনি এটাও সতর্ক করে বলেছিলেন যে পবিত্র ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শন এবং তাঁর নেতৃত্বে সর্বধর্মের সমন্বয়ের স্বাধীন বাংলাদেশ পছন্দ হয়নি ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক ভাবাপন্ন অপশক্তির। তাই তারা পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে জাতির ইতিহাসকে বিপরীতমুখী  করার সর্বাত্মক অপচেষ্টা চালায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সর্বপ্রকার সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটিয়ে, নিয়ত কলঙ্কিত করে এই ভূখন্ডের হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী হলেও বাঙালি সংস্কৃতি ও চেতনা এর মূল চালিকাশক্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পেছনের চালিকাশক্তি ছিল এই অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য। সারা পৃথিবী আজ পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পরে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের উগ্র আক্রমনে উদ্বিগ্ন। ধর্মকে অপব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক গুটির চাল হিসাবে। বাংলাদেশেও এক শ্রেণির ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী এই স্পর্শকাতর হাতিয়ারকে ব্যবহার করেছে।

ফলে হাজার বছর ধরে এদেশে যে র্ধমীয় সম্প্রীতি বিরাজমান মাঝে মাঝে তার ছন্দপতন হয়েছে । বহু স্থানে নানা রকম নিপীড়নের খবর আমাদের লজ্জিত করেছে। সাম্প্রদায়িকতা জিনিসটা যে কেমন নির্মম, কদর্য ও ক্ষতিকারক, সেটা আমরা অবশ্যই জানি। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে যে কী তা সব সময় খেয়াল করি না। কেন ঘটছে তা-ও বুঝি না। এই সাম্প্রদায়িকতার কারণে দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ পরস্পরকে ঘৃণা করে। ঘৃণা পারস্পরিক সংঘর্ষেরও জন্ম দেয়। রক্তপাত ঘটে। কিন্তু আমাদের দেশে তো বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে একত্রে বসবাস করে এসেছে। হিন্দু কৃষক ও মুসলমান কৃষকের মধ্যে সংঘর্ষ বাধেনি। তারা একে অপরকে উৎখাত করতে চায়নি। নদীতে হিন্দু জেলে ও মুসলমান জেলে একসঙ্গে মাছ ধরেছে। তাঁতিরা তাঁত বুনেছে। সাধারণ মানুষ একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে। একই পথ ধরে হেঁটেছে, একই বাজার-হাটে গিয়ে কেনাবেচা করেছে, থেকেছে একই আকাশের নিচে।

সমাজে সম্প্রীতি সৃষ্টির দায়টা যেমন রাষ্ট্রের তেমনি সাধারণ জনগণের।  মানসিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন শৈশবে সেক্যুলার পারিবারিক শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা, সমাজবদলের জন্য শহরে ও গ্রামে লাগাতার প্রচার। এ বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে র্ধম র্বণ নির্বেশেষে সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে । প্রত্যকে ধর্মের মূলবাণী মানব কল্যাণ । হিংসা, জঙ্গীবাদ, উগ্রবাদ কোন ধর্মেই সর্মথন যোগ্য নয় । কোন ক্ষেত্রে অপশক্তির গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে, ধৈর্য্য ও বিচার বিবেচনা করে পারস্পরকি শ্রদ্ধাবোধ অন্তরে পোষণ করে র্ধমীয় বিষয়সমূহকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন । জাতির সৌভাগ্য এই যে, পিতার জীবন দর্শনকে আত্মস্থ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দূরদর্শী প্রজ্ঞাময় নেতৃত্বে দেশ ও জাতিকে আবার ইতিহাসের সঠিক পথে ফিরিয়ে এনেছেন। আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি। ললাটে যার নিত্য অর্জিত গৌরব চিহ্ন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শখে হাসনিা বলছেনে এদেশে কোন সংখ্যা লঘু নেই, র্ধম যার যার উৎসব সবার।

টেকসই উন্নয়নের জন্য যেমনি প্রয়োজন র্ধমীয় সম্প্রীতি তমেনি প্রয়োজন সামাজকি, রাজনতৈকি এবং সাংস্কৃতকি সম্প্রীতি। ২০৪১ একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি তার জন্য প্রয়োজন মানবকি বাংলাদেশের। যেখানে থাকবে মানুষরে প্রতি মানুষরে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধ । আমরা প্রত্যাশা করি একটি ফুলরে বাগানে যেমন অনেক ফুল বাগানকে র্পূণতা দেয় তেমনি এদেশে সকল ধর্মের মানুষ প্রত্যেকের সক্রিয়তা বজায় রেখে এদেশের উন্নয়নে কাজ করে দেশকে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই সেই উন্নত বাংলাদেশ, মানবিক বাংলাদেশ, সম্প্রীতির বাংলাদশে।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.