সতর্ক হওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)
বাংলাদেশ যে লক্ষ্যে ও উদ্দেশ্যে স্বাধীন হয়েছে তা যাতে বাস্তবায়িত হতে না পারে তার জন্য অনবরত যুদ্ধ করে যাচ্ছে এদেশীয় একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠী এবং তাদের বংশধররা। এই যুদ্ধের বহিঃপ্রকাশ বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন পন্থায় ও রূপে দেখা গেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশকে নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। জ্যোতির্ময় দার্শনিক বঙ্গবন্ধু জানতেন সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ ও তাতে অটুট থাকা এবং সে অনুসারে কাজ হলেই শুধু সফলতা অর্জন করা সম্ভব, সেটি ব্যক্তির জন্য যেমন প্রযোজ্য, রাষ্ট্রের বেলায় সেটি আরো অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি বাহাত্তরের সংবিধানের শুরুতে দ্বিতীয় লাইনে রাষ্ট্রের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিলেন। তাতে লেখা হলো, ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।’ অর্থাৎ জাতীয় মুক্তিই ছিল স্বাধীনতা অর্জনের মূল লক্ষ্য। শুধু ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতায় তিনি লক্ষ্যকে সীমাবদ্ধ করেননি। কিসের থেকে মুক্তি সে কথাও বঙ্গবন্ধু বলেছেন এবং সংবিধানে তার সব কিছু সন্নিবেশিত করেছেন। ধর্মান্ধতা, উগ্রবাদ, ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি, কুশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ এবং সমস্ত সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত থাকবে, এটাই মুক্তির মূল প্রতিপাদ্য। মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় শত্রু বৈষম্য, সেটি যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন।
সামগ্রিকভাবে একটা রাষ্ট্রের মানবসম্পদের মনোজগৎ সঠিক ও আধুনিক হলেই সব মানুষ ক্ষুধা ও দরিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারে, যার উদাহরণ বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার আগেই বিশ্বাঙ্গনে স্বতঃসিদ্ধ সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় একটা সম্ভাবনাময় স্থানে বাংলাদেশকে নিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু আদম সন্তান আর শয়তানের মধ্যে যেমন চিরশত্রুতা, তেমনি মুক্তিসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত যা কিছু আছে তার সঙ্গে এদেশীয় একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠী ও তাদের বংশধরদের চিরশত্রুতা। এখানে যুক্তিতর্কের কোনো স্থান নেই। ইংলিশ কবি জন মিল্টনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ মহাকাব্যের এক জায়গায় আছে, স্বর্গের মধ্যে শয়তান ও আদম-ঈভের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের এক পর্যায়ে গড শয়তানকে সাপে পরিণত করেন, অর্থাৎ শয়তান সাপের রূপ ধরে। ছোটবেলায় শুনেছি, সাপ মানুষের চিরশত্রু। কেন তা বুঝতে পারিনি, তখন ‘প্যারাডাইস লস্ট’ সম্পর্কে কিছু জানতাম না। আদম সৃষ্টির প্রতিহিংসায় এক ফেরেশতা শয়তান হয়ে যায়। অন্ধ যুক্তিহীন প্রতিহিংসাবশত যে শত্রুতার জন্ম, তার মীমাংসা হয় না। সেটাই ঘটেছে বাংলাদেশে। একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিহিংসা থেকে জন্ম হয়েছে বিএনপির এবং তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে জামায়াত-মুসলিম লীগের বাংলাদেশি বংশধররা, আর সংগত কারণেই পাকিস্তান তাদের মুরব্বি। সে কারণেই স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় এসেও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ রাজনৈতিক পক্ষের প্রতাপ দেখা লাগে, যার উদাহরণ বিশ্বে কোথাও নেই। আবার একটু পেছনের কথায় ফিরতে হবে। পঁচাত্তরের পরে দুই সামরিক শাসকের সময় উল্লিখিত চিরশত্রুতার চরম বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। সংবিধান থেকে রাষ্ট্রের লক্ষ্য এবং মৌলিক আদর্শ তাঁরা বাতিল করলেন। ফলে লক্ষ্যহীন হয়ে রাষ্ট্র অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে গেল। পারলে তাঁরা বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান বানিয়ে ফেলতেন, কিন্তু ৩০ লাখ মানুষের জীবন বিসর্জনের সহজাত অমোঘ শক্তির কারণে তা পারেননি। সামরিক শাসকের অন্যতম প্রতিভূ জামায়াত-বিএনপি সরকারের সময় ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিশ্বের বড় বড় মিডিয়া থেকে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়, বাংলাদেশ অচিরেই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো আরেকটি তালেবানপন্থী রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে। বিএনপি এখনো বাংলাদেশে স্বীকৃত অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল। কিন্তু মধ্যযুগীয় পশ্চাৎপদ পাকিস্তানপন্থী নীতি এবং চরম মূর্খতা ও অদূরদর্শিতার কারণে তারা এখন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে আর সুবিধা করতে পারছে না। একসময়ে জঙ্গি সন্ত্রাস ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের পথ তারা বেছে নেয়। তাতে শুধু ব্যর্থ নয়, বিশ্ব অঙ্গনে অভিহিত হয় সন্ত্রাসী দল হিসেবে। কানাডার একটা ফেডারেল আদালত পর্যন্ত রায় দিলেন—বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল।
সাইবারজগেক ব্যবহার করে যারা আজ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ চালাচ্ছে, ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তাদের পরিচয় এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরার জন্যই এত বড় একটা প্রাক-প্রসঙ্গ নিয়ে আন্দোলন করতে হলো। তথ্য-প্রযুক্তির বৈশ্বিক ঢেউয়ের মধ্যে পড়ে গেছে বাংলাদেশ। এর ইতিবাচক দিকের সুবিধা ব্যাপকভাবে পাচ্ছি, কিন্তু তার বিশাল ক্ষতিকর দিক থেকে বাঁচার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা খুবই দুর্বল। রাজনীতি ও সমরনীতির বড় অবলম্বন এখন সাইবারজগৎ। অপরাধের বড় জগৎও বটে। ইউটিউব ও ফেসবুকের মালিকরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অনেক শক্তিশালী। সীমাহীন আকাশকে ব্যবহার করে অনুমতি ব্যতিরেকেই তাঁরা বাংলাদেশের বিশাল বাজার দখল করে ফেলেছেন। এই সুযোগটিই গ্রহণ করেছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী। বিগত দুই-তিন বছর ধরে বাংলাদেশের কিছু ব্যক্তি বিদেশে বসে বহুপক্ষীয় যোগসাজশে দেশি-বিদেশি বিশাল অর্থায়নে ইউটিউব, ফেসবুকসহ কয়েকটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেভাবে চরম বিষোদগার করছে তা জনগণের নিরাপত্তার জন্য শুধু হুমকি নয়, রীতিমতো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। মানুষ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সহজাত প্রবৃত্ত হলো মুখরোচক রসালো, বিদ্বেষ, উত্তেজনাপূর্ণ সংঘাত সৃষ্টির বক্তব্য এবং কুরুচিপূর্ণ মিথ্যা ও চাঞ্চল্যকর কিছু ইউটিউবে, ফেসবুকে পেলেই তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। জ্ঞানগর্ভ, ইতিহাসনির্ভর রুচিপূর্ণ বক্তব্যের দিকে সহজে কেউ আকর্ষিত হয় না। দেশের বিরুদ্ধে এই অপকর্ম যাঁরা করছেন, তাঁদের মধ্যে মেজর-কর্নেল পদবির তিন-চারজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা এবং তিন-চারজন সাংবাদিক ফ্রন্টলাইনে ভূমিকা রাখছেন। মোবাইল ও ল্যাপটপে, ইউটিউব খুললেই এঁদের চরম মিথ্যাচারপূর্ণ রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কথাবার্তাগুলো অনবরত পর্দায় ভেসে উঠতে থাকে। এটাকে বলে বুস্টিং অর্থাৎ যে যত বেশি টাকা ইউটিউব কর্তৃপক্ষকে দেবেন তাঁদের বক্তব্য তত বেশি দর্শকদের সামনে আসতে থাকবে। তার মানে এর পেছনে বিশাল টাকা বিনিয়োগ হচ্ছে। এত দিনে যেসব তথ্য-উপাত্ত সামনে এসেছে তাতে নিশ্চিত করে বলা যায়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই দেশে-বিদেশে গচ্ছিত জামায়াতের বিশাল অর্থভাণ্ডারসহ আরো অনেকেই এর পেছনে অর্থ ঢালছে।
এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে, সমন্বিত পন্থায় বর্তমান সরকারকে ভায়োলেন্সের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে উত্খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে এরা কাজ করছে। ২০১৫-২০১৬ সালে ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাসের দুজন কর্মকর্তা জঙ্গি অর্থায়নে জড়িত থাকার অভিযোগে দেশে ফেরত যেতে বাধ্য হন, জামায়াতকে পাকিস্তান তাদের নিজস্ব লোক মনে করে, জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে ভারতের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহযোগিতা করতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের না থাকলে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়া হয়, ইত্যাদি কারণে যৌক্তিকভাবেই মনে হওয়া স্বাভাবিক; এর পেছনের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা হচ্ছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। বাংলাদেশ থেকে অনেকে ব্যক্তিগতভাবে হয়তো এদের অর্থ জোগাচ্ছে।
জঙ্গি সংগঠন হামজা ব্রিগেডকে ২০১৫ সালে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদানের জন্য বিএনপিপন্থী আইনজীবী ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, অ্যাডভোকেট মাহফুজ চৌধুরী বাপন ও অ্যাডভোকেট হাসানুজ্জামান লিটন গ্রেপ্তার হন। ২০১৫ সালের ২০ আগস্ট সব পত্রিকায় এ বিষয়ের ওপর সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। যারা দেশদ্রোহী জঙ্গিদের অর্থ দিতে পারে, তারা ওই সব অবৈধ ইউটিউব পরিচালনাকারী সাংবাদিকদের অর্থ দেবে সেটাই স্বাভাবিক। গত দুই বছর ধরে তারা এই অপকর্ম করছে, অথচ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে তার কোনো প্রতিফলন নেই। এই চিহ্নিত ব্যক্তিদের ইউটিউব, ফেসবুকের প্রচারণাগুলো সরকার অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করতে পারে। বিদেশে যারা বসে আছে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে হতে পারে, দেশের ভেতরে বসে যেসব লোক এদের ইউটিউবে ইন্টারভিউ দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজে উৎসাহিত করছে, তাদের বিরুদ্ধেও এ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল। আইন ও বিচারব্যবস্থার অকার্যকারিতায় জঙ্গি-সন্ত্রাসী এবং এসব রাষ্ট্রদ্রোহী পার পেয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ক আইনটিকে বিতর্কিত করে ফেলা হয়েছে। আমাদের থেকে অধিকতর গণতান্ত্রিক দেশ আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া সাইবারজগেক নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এরই মধ্যে কঠোর আইন করেছে। সেসব দেশে আইন অমান্য যেমন কেউ করতে পারে না, তেমনি আইনের অপব্যবহার কঠিনভাবে দমন করা হয়। আমাদের প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর অবস্থা হয়েছে এমন যে ধাক্কা খেয়ে পড়ে না যাওয়া পর্যন্ত কারো হুঁশ হয় না। যখন হুঁশ আসে তখন দেখা যায় বিরাটকায় এক দৈত্য সামনে দণ্ডায়মান। সুতরাং সতর্ক হওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *