২২শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৪:৪২
২২শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৪:৪২

সংকট উত্তরণের উপায় খুঁজতে হবে

  • আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

 

আমরা বারো ভূতের দেশ। এক ভূত কাঁধ থেকে না নামতেই আরেক ভূত কাঁধে চাপে। আমি বুঝতে পারি না, শেখ হাসিনা কী করে এই দেশ চালান। অন্য কেউ হলে এই বারো ভূতের দেশ থেকে বিদায় নিতেন। কিন্তু শেখ হাসিনা সাহসের সঙ্গে সব সংকটের মোকাবেলা করছেন। বর্তমানের সংকটটি তাঁর সরকারের দ্বারা সৃষ্ট নয়। এটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। ইউক্রেনের যুদ্ধের ফলে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি ঘটেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের। বাংলাদেশেও তাই ঘটেছে। সাহসের সঙ্গে এই সংকটের মোকাবেলা করা ছাড়া কিছু করার নেই। বাংলাদেশ সরকার তা-ই করছে।

হাসিনা সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য বাজারে তারা চাল বা অন্য কোনো দ্রব্যের অভাব ঘটতে দেয়নি। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সরকার টিসিবির পণ্য পৌঁছে দিতে চেষ্টা করছে। এই সময়ে বিরোধী দলের কর্তব্য ছিল কী? সরকারকে এ সংকট মোকাবেলায় সাহায্য করা। সংকটের একটি সমাধান বের করা।

 

পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষের সময় আমরা কী দেখেছি? দেশের সব রাজনৈতিক দল সরকারের বিরোধিতা না করে জেলায় জেলায় লঙ্গরখানা খুলেছিল। এখন তো বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হয়নি। বাজারে কোনো জিনিসের অভাব নেই। দাম বেড়েছে। তেমনি সমাজের একেবারে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর আঘাত পড়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত প্রচণ্ড চাপের মুখে আছে। তাদের কী করে সাহায্য করা যায়, তার সমাধান বিরোধী দলগুলো সরকারকে জানাতে পারে। সব রাজনৈতিক দলকে সংকট উত্তরণের উপায় বের করতে হবে।

কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) তো সব সমস্যায়ই নানা পরিকল্পনা দেয়। বাংলাদেশেও যে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, তার কী করে মোকাবেলা করা যায়, সে সম্পর্কে একটি পরিকল্পনা তারা সরকারকে দেয় না কেন? তাহলে তো গরিব-দুঃখী মানুষের এই গরিব-দরদি পার্টির দরদ বোঝা যেত। গরিব-দুঃখী মানুষের অভাব মোচনের ব্যবস্থা না করে তারা যদি মিছিল-মিটিংয়ে নামে তাতে ওই গরিব-দুঃখীর অভাব মোচন হবে কি?

 

দেশের জনগণ মিছিল-মিটিং-হরতাল চায় না, বিএনপি এই সত্যটি বুঝেছে। মানুষ চায় তাদের অভাব মোচনের ব্যবস্থা। কোনো সরকার যখন ইচ্ছাকৃতভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়ায় অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে জনগণকে শোষণ করে, তখন তার বিরুদ্ধে মিছিল-মিটিং-হরতাল অবশ্যই করা চলে। হাসিনা সরকার করোনা সমস্যার যেমন মোকাবেলা করেছে, তেমনি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সংকট সমাধানের জন্যও চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারের কোনো গাফিলতি থাকলে দেশের তথাকথিত বামপন্থীরা কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব সরকারকে জানাতে পারে। তা না করে তারা এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সংকটকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। সিপিবি (বা অন্য বামপন্থীরা) কি মনে করে তারা এ সংকটকে কাজে লাগিয়ে তাদের হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে? মিছিল-মিটিং করে হরতাল ডেকে গরিব মানুষকে আরো পীড়ন করা হবে। এ সত্যটি হয়তো দেশের বামপন্থী দলগুলোর উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতারা বুঝে উঠতে পারছেন না। তাঁরা এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সমস্যায় পড়েননি। তাই গরিবের দুঃখ বুঝে উঠতে পারেননি। এটা বুঝতে পেরেছিলেন চল্লিশের দশকের কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা। তাঁরা ভুখা মানুষকে বাঁচানোর জন্য জেলায় জেলায় লঙ্গরখানা খুলেছিলেন।

বর্তমান বাংলার বিলাসপ্রিয় বাম নেতারা যদি মনে করে থাকেন, মিটিং-মিছিল দ্বারা তাঁরা তাঁদের হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাবেন, তাহলে তাঁরা আহাম্মকের মতো মিথ্যা আশায় ভুগছেন। জনগণের কাছে তাঁদের কদর আদৌ বাড়বে না। এটা আগামী সাধারণ নির্বাচনেই প্রমাণিত হবে। তাঁরা কী মনে করেন আগামী নির্বাচনে তাঁরা জাতীয় সংসদে একটি আসনও পাবেন? তাদের অতীতের রেকর্ড কী বলে? বাম নেতাদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের নৌকায় চড়ে জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছেন। বাকিরা তো কুপোকাত। এ দৃশ্যের পুনরাভিনয় আগামী নির্বাচনেও দেখতে হবে।

 

এদিক থেকে বিএনপি এবার বেশ চাতুরীর পরিচয় দিয়েছে। মিটিং-মিছিল ডেকে জনগণের কাছে অপ্রিয় হওয়ার চেয়ে তারা ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে বয়োবৃদ্ধ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে মাঠে নামিয়েছে। আশা করা গিয়েছিল, এই নেতা যিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দ্বারা চালিত হবেন এবং দলনিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ করে জাতির নিরপেক্ষ অভিভাবক হবেন। তিনি তা হননি। তিনি নামে নিরপেক্ষ, কিন্তু কাজে বিএনপির তল্পিবাহক। বিএনপিকে একবার এক পরামর্শ দিতে গিয়ে তিনি ছাত্রদলের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। তাতে কী! ‘মেরেছ কলসির কানা, তা বলে কী প্রেম দেব না’! তিনি বিএনপিকে এই প্রেম বিলিয়েই চলেছেন। বিএনপি তাঁকে এবার মাঠে নামিয়েছে জনগণ হরতাল পছন্দ করে কি না তা পরীক্ষার জন্য। যদি জনগণ ডা. জাফরুল্লাহর একক ডাকে সাড়া দিয়ে আংশিক হরতালও পালন করে, তাহলে তারা নিজেরা মাঠে নামবে। হরতাল ডাকবে। তাতে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি হয়ে দ্রব্যমূল্য বাড়লে তাদের পরোয়া নেই। তারা চায় ক্ষমতা। এই ক্ষমতার জন্য তারা দেশে প্রায় সাড়ে তিন বছর অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল। এই অরাজকতা সৃষ্টিতে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়েনি, আরো কমেছে। সরকার জনগণের সহায়তায় বিএনপির সেই তাণ্ডব প্রতিহত করেছে।

 

বিএনপি যদি নিয়মতান্ত্রিকভাবে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানায়, তাহলে আপত্তি নেই। কিন্তু অনিয়মতান্ত্রিকভাবে মাঠে নামতে চাইলে জনগণই তা রুখে দেবে। ডা. জাফরুল্লাহ ২৮ মার্চ হরতাল ডেকেছেন। সেই হরতাল কেউ পালন করবে কি? দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি সরকারকে কোনো উপদেশ দিতে পারতেন। তা না করে বটগাছের ডালে বসে বৃদ্ধ কাকের মতো কা কা করলে কোনো লাভ হবে কি? ২৮ তারিখে হরতাল ডেকে তিনি সম্ভবত নিজেই লন্ডনে চলে আসছেন। এখানে বিতর্কিত চরিত্রের এক ব্যক্তির সভাপতিত্বে পার্লামেন্ট হাউসে একটি সম্মেলন হচ্ছে। সম্ভবত তিনি তাতে মাননীয় অতিথি হয়ে আসছেন। যদি আসেন, তাহলে বুঝতে হবে এই সম্মেলনের মূল উদ্যোক্তাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা আছে। এ সম্মেলনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানানোর কথা বলা হয়েছে। যাঁদের সম্মান জানানো হবে তাঁদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। অসৎ দুধ বিক্রেতা যেমন দুধের সঙ্গে পানি মেশায়, এই সম্মেলনেও সম্মাননা জানানোর জন্য প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও নকল মুক্তিযোদ্ধাদের মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। উদ্দেশ্য নকলদের কপালে আসল মুক্তিযোদ্ধাদের ছাপ লাগানো।

 

ডা. জাফরুল্লাহ একসময় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী; রাজাকারদের দ্বারা ভর্তি একটি দলের অভিভাবক সেজেছেন। জাতি যে তাঁকে এই অভিভাবকত্ব দেয়নি, তার প্রমাণ ২৮ তারিখেই হবে। তিনি অপেক্ষা করুন।

বিএনপি এবং তথাকথিত বামদের উদ্দেশ্যও মাঠে মারা যাবে। এই মুহূর্তে সরকারের ভালো-মন্দের বিচার না করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জাতীয় দুর্যোগে দল-মত-নির্বিশেষে সবার উচিত সরকারকে সাহায্য করা এবং তাদের কাছে যদি এই সমস্যা সমাধানের কোনো উপায় জানা থাকে, তা সরকারকে জানানো। তা না করে এখন দেশে গোলযোগ সৃষ্টি করে অসৎ ব্যবসায়ীদের দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর আরো সুযোগ করে দিলে এটা জাতির প্রতি কর্তব্য পালনে বিরোধী দলগুলোর ব্যর্থতা বলেই গণ্য হবে। বামদেরও কোনো সুবিধা হবে না। জনগণের দ্বারা তাঁরা প্রত্যাখ্যাত হবেন এবং তাঁদের অবস্থা হবে ‘শিয়ালের আঙুর ফল বড় টক’, এই চিৎকারের মতো।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এখন নানা সমস্যায় বেষ্টিত। চীন ও আমেরিকা এই দুই মহাশক্তির চাপে সরকার বিচলিত হবে—এটাই বিরোধী দলগুলো আশা করেছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সাহসের সঙ্গে সমস্যাটির মোকাবেলা করছেন। জাতিসংঘে সাহসের সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ভোট দেয়নি। এই বিচক্ষণতার জন্য শুধু প্রধানমন্ত্রীকে নয়, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনকেও ধন্যবাদ জানাই। বিভিন্ন চাপের মুখেও তিনি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে সঠিক পথে ধরে রাখতে পেরেছেন।

জাতীয় বিপর্যয়ে কী করে সহিষ্ণুতা অবলম্বন করতে হয় তা এই ব্রিটেনে বাস করে দেখেছি। বাংলাদেশের মানুষকে তা শেখাতে হবে না। পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষে মানুষ যখন অনাহারে রাস্তাঘাটে মরেছে, তখনো তারা রাস্তায় নামেনি বিক্ষোভ-মিছিল করার জন্য। আমেরিকার দার্শনিক-রাজনীতিক ওয়েন্ডেল উইলকি একসময় অবিভক্ত বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি দুর্ভিক্ষের করুণ অবস্থা দেখে তাঁর সফরনামায় লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত ধৈর্যশীল। ’ পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ ছিল মনুষ্যসৃষ্ট।

 

বাংলাদেশে বর্তমান সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানোর যেমন চেষ্টা করছে, তেমনি বাজারে খাদ্যের অভাব ঘটাতে দেয়নি। এই পরিস্থিতির মোকাবেলায় সরকারকে আরো সমস্যায় না ফেলে দেশের দল-মত-নির্বিশেষে সবার উচিত সরকারকে সাহায্য করা। তাতে দেশের মানুষ বাঁচবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সরকারের অন্য কোনো ব্যর্থতার প্রতিবাদে তারা মাঠে নামতে পারে। তখন কেউ বলবে না, তারা বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে কোনো চক্রান্ত করছে। ওই স্বাভাবিক অবস্থায়ই আমাদের বামদেরও উচিত হবে তাদের জনপ্রিয়তা পরীক্ষা করা; যে পরীক্ষায় তারা সাম্প্রতিক অতীতে সফল হয়নি, তেমনি বর্তমানেও হবে তেমনটি আশা করা উচিত হবে না।

আরও পড়ুন..