শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন: বিশ্বে আজ মর্যাদার আসনে বাংলাদেশ

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • তাপস হালদার

‘রাজধানী ঢাকা গতকাল (১৭ মে, ১৯৮১) মিছিলের শহরে পরিণত হয়েছিল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মিছিল। শুধু মিছিল আর মিছিল।প্রচন্ড ঝড়বৃষ্টিও মিছিলের গতিরোধ করতে পারেনি। স্লোগানেও ভাটা পড়েনি।লাখো কন্ঠের স্লোগান নগরীকে প্রকম্পিত করেছে। গতকালের ঢাকা ন’বছর আগের কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশে এসেছিলেন, সেদিন স্বজন হারানোর কথা ভুলে গিয়েও লাখ লাখ জনতা রাস্তায় নেমে এসেছিল নেতাকে একনজর দেখার জন্য। গতকালও হয়েছে তাই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনাকে একনজর দেখার জন্য ঢাকায় মানুষের ঢল নেমেছিল। কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শেরেবাংলা নগর পরিনত হয়েছিল জনসমুদ্রে। ফার্মগেট থেকে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর পর্যন্ত ট্রাফিক বন্ধ ছিল ছয় ঘন্টা।’ (বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে ১৮ মে ১৯৮১,দৈনিক সংবাদ)

সেদিন সারা দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মুক্তিকামী মানুষ ছুটে এসেছিল ঢাকায়। ‘জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘শেখ হাসিনার আগমন,স্বাগতম শুভেচ্ছা’, ‘শেখ হাসিনা তোমায় কথা দিলাম,পিতৃ হত্যার বদলা নিব’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা সপরিবারে হত্যা করে। কিন্তু সেসময় জার্মানি অবস্থান করার কারনে জাতির পিতার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। জার্মানি নিরাপদ না হওয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সহায়তা দিল্লীতে চলে আসেন। সেখানে দীর্ঘ ছয় বছর প্রবাস জীবন অতিবাহিত করেন।

১৯৮১ সালের ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মলনে দলের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দিল্লীতে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। পাকিস্তানী মদত পুষ্ট সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান বিষয়টি সহজ ভাবে নেন নি। বঙ্গবন্ধু কন্যা যখন দেশে ফিরতে প্রস্তুতি শুরু করেন তখন জিয়াউর রহমান সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করে তৎকালীন স্ব-রাষ্ট্রমন্ত্রী এ.এস.এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘জননিরাপত্তার স্বার্থে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে দেয়া হবে না। আইন অমান্য করে যদি দেশে ফিরতে চান তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জিয়া সরকারের নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পরই দিল্লীতে অবস্থানরত নব-নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা জরুরী সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ‘আমাকে হত্যা করা হলেও আমি মাতৃভূতিতে ফিরব। মাতৃভূমিতে ফেরা আমার জন্মগত অধিকার। এই অধিকার কেউ কেঁড়ে নিতে পারবে না।আজ যারা আমাকে দেশে ফিরতে বাধা দিচ্ছে একদিন হয়তো তারা জনরোষের ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাবে। ‘সেদিনকার সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের কোন সংবাদপত্র না ছাপালেও কলকাতার আনন্দবাজার সহ ভারতের প্রথম সারির সংবাদ মাধ্যম গুলোতে ফলাও করে প্রকাশ করলে টনক নড়ে সরকারের। ৮ মে ১৯৮১, আনু্ষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।তারপর সেই ঐতিহাসিক মুহুর্ত ১৭ মে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের মাটিতে ফিরে আসেন।

প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে তেঁজগাও বিমান বন্দর থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ পর্যন্ত জনতার ঢল নেমেছিল। দশ লক্ষাধিকেরও বেশি লোকের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি,বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তা বাস্তবায়ন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই,বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই।’

আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিয়ে তিনি স্বৈর শাসনের অবসান,গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এনেছেন। টানা তিনবার সহ মোট চারবার বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে উন্নয়নের মহাসড়কে। এক সময়ের তলাবিহীন ঝুঁড়ি,এখন সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ -২০০১ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ভারতের সাথে ৩০ বছর মেয়াদী ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি চুক্তি,পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি,প্রথমবারের মত দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে বাংলাদেশ। দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় দুস্থ মহিলা ও বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, আশ্রয়ণ প্রকল্প, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প সহ নানাবিধ কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়।

২০০৮ সালে দিন বদলের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসে সত্যিই বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। ২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারী ক্ষমতা গ্রহণ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর খুনি ও একাত্তরের মানবতাবিরোধী নরঘাতকদের বিচার ও রায় কার্যকর করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ, তথ্য প্রযুক্তি, নারীর ক্ষমতায়ন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানসহ নানামূখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১৪ সালে পুনরায় ক্ষমতায় এসে কোন প্রকার সংঘাত ছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিস্পতি এবং ভারতের সাথে ৬৫ বছরের পুরনো ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। ১১ লক্ষ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে দেশরত্ন শেখ হাসিনা ‘মানবতার মা’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৮ সালে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশ এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ,নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মান, দেশকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনা, মাথাপিছু আয় ২৮২৪ ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশকে সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলায় পরিনত করতে বঙ্গবন্ধু কন্যা ভিশন-২১ বাস্তবায়ন করে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মানের জন্য ভিশন-৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়াও উন্নয়নকে স্থায়ী ভিত্তির উপর দাড় করাতে নেয়া হয়েছে ডেল্টা প্লান-২১০০। জনগনের কল্যানে দেশরত্ন শেখ হাসিনার এসব যুগান্তকারী পদক্ষেপ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বৈশ্বিক করোনা মহামারি কালেও নেতৃত্বের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন শেখ হাসিনা। মানুষের জীবন ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য তিনি যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, আজ তার স্বীকৃতি দিচ্ছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব। অতিসম্প্রতি জাপান ভিত্তিক ‘নিক্কেই এশিয়া’র জরিপে করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ দক্ষিন এশিয়ায় প্রথম এবং বিশ্বের পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ৪১ বছরে তিনি আওয়ামী লীগের গন্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশের সম্পদে পরিনত হয়েছেন। তিনি এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্যের প্রতীকে পরিনত হয়েছেন। তিনি দেশে ফিরে এসেছিলেন বলেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন,অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিতে সারা বিশ্বের কাছে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে।

 

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২২, বাহান্ন নিউজ ডট কম।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.