শেখ হাসিনার কারাবরণ: গনতন্ত্রের ইতিহাসে কালো দিন

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • তাপস হালদার

 

১৬ জুলাই, বাংলাদেশের গনতন্ত্রের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক দিন। ২০০৭ সালের এই দিনে গনতন্ত্র হত্যা করার জন্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেসময় বহুল চর্চিত একটি শব্দ ছিল ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা। অর্থ্যাৎ দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করা। মাইনাস টু-র আড়ালে ছিল মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা। রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনাকে মাইনাস করা।

শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার প্রচেষ্টা নতুন নয়। তিনি যেদিন থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসেছেন সেদিন থেকেই এ প্রচেষ্টা শুরু হয়। কখনো গ্রেপ্তার কিংবা গৃহবন্দি, আবার কখনো হত্যা করার চেষ্টা। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদ তাঁকে রাজনৈতিক হুমকি মনে করে প্রতি পদে পদে বাধা দিতে থাকেন। আওয়ামী লীগের আন্দোলনে স্বৈরশাসকের ক্ষমতা বাধাগ্রস্থ হতে পারে এই আশংকায় ১৯৮৩ সালের ১৫ অক্টোবর শেখ হাসিনা আটক করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে রাখা হয়। এটাই ছিল শেখ হাসিনার প্রথম বন্দিজীবন। সে বছরের ২৯ নভেম্বর আবার নিরাপত্তা হেফাজতে নেওয়া হয়। ১৯৮৫ সালের ১ মার্চ সামরিক বিধি পুনর্বহাল ও রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে ফের গৃহবন্দি করা হয়, যা চলে ২৫ মে পর্যন্ত। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর আরেকদফা গৃহবন্দি করা হয়। এছাড়া চার দশকের রাজনীতিতে তাঁকে ১৯ বার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্রগ্রামে সমাবেশ করতে গেলে স্বৈরশাসকের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ-বিডিআরের বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ৫ জন নিহত হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। আর ২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের দলীয় সমাবেশে আরও ভয়ঙ্কর হামলার শিকার হন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারান। ভয়াবহ সেই হামলায় সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

১/১১ সরকার ছিল আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে সকল প্রকার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গুলো ধ্বংস করে দেয়। তত্বাবধায়ক সরকারে নিজেদের দলীয় লোক বসানোর জন্য বিচারপতিদের বয়স দুই বছর বাড়িয়ে দেয়। তাদের দলীয় ক্যাডারদের সারা দেশে নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করে। ১ কোটি ২৩ লক্ষ ভূয়া ভোটার তালিকা ভুক্ত করে।এসবের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট তীব্র আন্দোলন শুরু করলে নিজের নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপতি ইয়াজিউদ্দিনকে তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারী নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করে। দু-দলের মুখোমুখি অবস্থানে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী এগিয়ে আসে। বিএনপির নিয়োগকৃত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়।

শুরুতে সরকারের উদ্দেশ্য ভালো থাকলেও কিছু দুষ্টচক্র ক্ষমতার হালুয়া-রুটির লোভে নানা ফন্দি ফিকির শুরু করে। ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে দুর্নীতি দমনের নামে রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করতে শুরু করে।জরুরী অবস্থা জারি করে রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়। যে শেখ হাসিনার বদৌলতে তারা ক্ষমতায় এসেছে,ক্ষমতায় থাকার অন্তরায় হিসেবে সেই শেখ হাসিনাকেই তাদের টার্গেটে পরিনত করে। তারা শেখ হাসিনাকে মাইনাস করতে দু’টি পরিকল্পনা গ্রহন করে।প্রথমত রাজনীতি থেকে নির্বাসন, দ্বিতীয়ত গ্রেপ্তার। শেখ হাসিনা অসুস্থ মেয়েকে দেখতে যুক্তরাষ্ট্র গেলে দেশে ফিরতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। এবং গ্রেপ্তারের ভয় দেখাতে একাধিক চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা রুজু করে। সকল ভয় ভীতি উপেক্ষা করে ৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন।দেশে ফিরে সরকারের কর্মকান্ডের প্রবল প্রতিবাদ এবং দ্রুত নির্বাচনের দাবি তোলেন। ক্ষমতা লোভী সরকার অবস্থা বেগতিক বুঝে দ্রুতই শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের পথ তৈরি করতে থাকে। প্রথমে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা দুর্নীতির মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার, আরেক পক্ষকে ভয় ভীতি দিয়ে দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির জন্য সংস্কারপন্থী গ্রুপ তৈরি করা হয়। এরকম একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে ১৬ জুলাই ভোরে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বে দু’টি গুরুত্বপূর্ন কাজ করেছেন। প্রথমত বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের পরীক্ষিৎ নেতা জনাব জিল্লুর রহমানকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, দ্বিতীয়ত করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি লিখেন।

চিঠিটি হুবহু এ রকম ছিল:-

প্রিয় দেশবাসী,
আমার ছালাম নিবেন। আমাকে সরকার গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। কোথায় জানি না। আমি আপনাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেই সারাজীবন সংগ্রাম করেছি। জীবনে কোনো অন্যায় করিনি। তারপরও মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। উপরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ও আপনারা দেশবাসী আপনাদের উপর আমার ভরসা। আমার প্রিয় দেশবাসী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের কাছে আবেদন কখনও মনোবল হারাবেন না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। যে যেভাবে আছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। মাথা নত করবেন না। সত্যের জয় হবেই। আমি আছি আপনাদের সাথে, আমৃত্যু থাকব। আমার ভাগ্যে যাহাই ঘটুক না কেন আপনারা বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যান। জয় জনগণের হবেই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়বই। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবোই।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
শেখ হাসিনা, ১৬.০৭.২০০৭

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পূর্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে যে বার্তা দিয়েছিলেন, সেটিকে ধারণ করেই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। ঠিক ৩৬ বছর পর তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনার চিঠিটিও দেশবাসীকে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদীপ্ত করেছিল।

গণতন্ত্রকে বন্দি করার জন্যই সেদিন জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু সেদিন যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা অনুভব করতে বাধ্য হয়েছে যে, মুক্ত শেখ হাসিনার চেয়েও বন্দি শেখ হাসিনা অনেক বেশি শক্তিশালী। সেদিনের শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে মাত্র ১৫ দিনে ২৫ লক্ষ লোক গনস্বাক্ষর করেছিল। তৃণমূল নেতাকর্মীদের ইস্পাত কঠিন ঐক্যে সংস্কারপন্থীরা হারিয়ে যায়।শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে দেশে-বিদেশে গণজাগরণ তৈরি হয়। অবস্থা বেগতিক বুঝে সরকার ২০০৮ সালের ১১ জুন শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৯ ডিসেম্বর,২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। তারপর থেকে টানা তিন মেয়াদে নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন মর্যাদার আসনে।

প্রকাশকাল: ১৬ জুলাই ২০২২, বাহান্ন নিউজ

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য,সম্প্রীতি বাংলাদেশ


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.