শেখ কামাল নয় টার্গেট বঙ্গবন্ধু

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন প্রতিদিনই দেখেছি শেখ কামালকে। দেখেছি নয়, দেখা হয়েছে। কলাভবনের করিডরে, সোসিওলজি ডিপার্টমেন্টের জটলায়, মধুর ক্যান্টিনের চত্বরে, টিএসসি ক্যাফেটারিয়ায়, শরীফ মিয়ার চায়ের দোকানে, বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে, টিএসসির দোতলায় নাটকের রিহার্সেলে। কোন না কোন জায়গায় দিনে এক বা একাধিকবার দেখা হতোই। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে থাকা অনবদ্য এক যুবক। সাদামাটা মধ্যবিত্ত চেহারা। অথচ কী প্রাণবন্ত! বিশেষণ বিহীন আকর্ষণীয় ঔজ্জ্বল্য-বসন ভূষণে, চাল-চলনে, আলাপচারিতায়, তুমুল আড্ডায়। সতত সারল্যমাখা সহজিয়া চরিত্রের অমন মানুষ অন্তত আমার জীবনে দেখিনি।

‘ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যরে লহ সহজে’- কবিগুরুর অমোঘ দর্শনের যথার্থ অনুসারী ছিলেন শেখ কামাল। জাতির পিতার পুত্র হওয়া সত্ত্বেও মিথ্যা অপবাদ শুনতে হয়েছে, শরীরে কাদা লাগানোর অপচেষ্টাও হয়েছে, কিন্তু শেখ কামাল নির্বিকার। অদৃষ্টকে হাস্য মুখে পরিহাস করে বরং অধিকতর নিবিষ্ট হয়েছেন শুভ কর্মযজ্ঞে। একা নয়, বহুজনকে নিয়ে। বহুতর কর্মপরিকল্পনায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্পেশাল ট্রেনিংয়ের প্রথম ব্যাচে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শেখ কামাল স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে ফিরে এসেছিলেন নিজ ভুবনে। হাত দিলেন ক্রীড়া, সঙ্গীত, নাট্য, শিক্ষা, সমাজ এবং তারুণ্যের রাজনীতি বিনির্মাণে। সেই সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় ও সুন্দর করা। পিতা স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, সারাক্ষণ দেশ ও মানুষের কল্যাণে ব্রতী। সংসারের সর্বময় দায়িত্ব মাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের হাতে। তাঁকে সহায়তা করতে পাঁচ ভাই বোন সদা উদগ্রীব। এক অসাধারণ পবিত্র এবং সুখের আবহ বত্রিশ নম্বরের বাড়িময়। মাথার ওপরে দেদীপ্যমান উজ্জ্বল বঙ্গবন্ধু-অথচ বত্রিশ নম্বরের বাড়ি শান্ত, স্নিগ্ধ, সুখী গৃহকোণ। প্রচলিত আছে, সূর্যের তাপ সহ্য করা যায় কিন্তু তপ্ত বালুর তাপ নাকি অসহনীয়। কিন্তু এই বাড়ির কারও চরিত্রেই সহ্যের রহিত তাপ নেই, অশোভন আচরণ নেই, ক্ষমতার অপব্যবহার নেই। শেখ কামালের চরিত্রে পরিবারের সুস্থ ও পবিত্র আবহের প্রভাব তো ছিলই। যার ফলে তিনি ছিলেন বন্ধুবৎসল, পরোপকারী, নিরহংকারী সজ্জন এক যুবক। শেখ কামালের শিষ্টাচার সম্পর্কে জানতে বেগম সুফিয়া কামাল এবং শিক্ষাবিদ আবুল ফজলের দুটি নিবন্ধ প্রাণিধানযোগ্য। নিবন্ধ দুটি পড়লে তাঁর সহজাত শিষ্টাচার সম্পর্কে পরবর্তী প্রজন্ম যে শিক্ষা লাভ করবেন, তা পরম্পরায় দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আগেই উল্লেখ করেছি মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে শেখ কামাল সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছিলেন রাজনীতি-সমাজ-সঙ্গীত-নাট্যের কর্মযজ্ঞে। সেই সময়ে সতীর্থ স্বজনরা এটাকে নিছক বিনোদন ভেবে ভুল করেছিলাম। এই সব কর্মযজ্ঞের ভিতর গূঢ় এক দর্শন ছিল। ছিল ইতিবাচক উদ্দেশ্য এবং সুদূরপসারী লক্ষ্য। শেখ কামালের লক্ষ্য ছিল আধুনিক এক সমাজ গড়ার। বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’র অন্তর্নিহিত সঠিক রূপটি বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। বুঝেছিলেন জাতির মনোগঠনের দায়িত্ব বাদ দিয়ে সুস্থ সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চা হয় না। আর সুস্থ চর্চা ও সুপরিকল্পনা বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়াও সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু যেমন বাংলার মূল শিকড় উপড়ে ফেলে ‘সোনার বাংলা’ গড়তে চাননি, তেমনি শেখ কামালও চেয়েছিলেন বাংলার পবিত্র মাটির ওপর দাঁড়িয়েই বিশ্বের আধুনিক দেশ ও সমাজের সমকক্ষ হতে। এটাই তো পরম্পরার প্রকৃত শিক্ষা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তা-চেতনা, কর্মোদ্যোগ এবং সকল অর্জনেও বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলার’ অন্তর্নিহিত রূপের উজ্জ্বল বর্ণচ্ছ্বটারই বহির্প্রকাশ ও প্রতিফলন। বড় বোন এবং ছোট ভাইয়ের ভাবনায় কী অদ্ভুত ঐক্যতান! জীবন দর্শন, দেশপ্রেম, মানুষ ও প্রাণিকুলের প্রতি ভালবাসা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রীতি- সব মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবারটিই ছিল এক সুর ও এক তালে বাঁধা। সকল হারিয়েও শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা মূল সুরটি আজও অটুট রেখেছেন, বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। শত কষ্ট সয়েও ধরে রেখেছেন বত্রিশ নম্বরের পারিবারিক ঐতিহ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সোসিওলজি ডিপার্টমেন্টে, খেলার মাঠে, নাট্যমঞ্চে জাতির পিতার পুত্র হিসেবে শেখ কামাল কখনও বাড়তি কিছু প্রত্যাশা করেছেন বলে শোনা যায় না। শিক্ষকদের সঙ্গে ছিল গুরু-শিষ্যের পবিত্র সম্পর্ক। নিয়মিত ক্লাস করা, পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়া, ফল যাই হোক তা মেনে নেয়া- অন্যসব ছাত্রের মতোই ছিল স্বাভাবিক আচরণ। কোথাও, কখনও কোন ব্যাপারেই বাড়তি কিছু পাবার জন্য প্রভাব খাটিয়েছেন এমন কথা সহপাঠীদের মুখ থেকে কেউ শুনেছেন বলে শুনিনি। তবু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, জীবিতাবস্থাতেই তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে অনেক মিথ্যা অপবাদ। মৃত্যুর পর বছরে বছরে তা চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েছে। যে যুবক সারাক্ষণ নিমগ্ন থাকতেন শুভ কর্মযজ্ঞে, যে যুবকের মুখ কখনও বিষাদের ছায়ায় মলিন হয়নি, যে যুবককে দেখলেই উদ্দীপ্ত যৌবনের দূত বলে বিশ্বাস করতে দ্বিধা হতো না, যে যুবক কিনা জীবনে সিগারেটের নেশা পর্যন্ত করেনি- সেই শেখ কামালের চারিত্রিক দোষ ধরার পরিকল্পিত চেষ্টা করা হয়েছে। দুঃখজনক হলেও এটা সত্য। কিন্তু এই দুঃখজনক সত্যের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর গভীরতম দূরভিসন্ধি এবং সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন এবং সত্য আবিষ্কারের দায়িত্ব এবং কাজ রাজনীতি বিশ্লেষকদের, ইতিহাস চর্চাকারীদের, গবেষকদের। সেই সব সত্য নিয়ে অমর কাব্য লিখবেন তারা। আমি অতি সামান্যজন দু’একটি কথা এ প্রসঙ্গে বলার চেষ্টা করি। সব দায় গবেষকদের ওপর ছেড়ে দিয়ে আমরা তো বসে থাকতে পারি না। আমরা যদি কেবল নিজ পরিচয় ও অস্তিত্ব বড় করে জাহির করি তাহলে ভীষণ ভুল হবে না কি! পঁয়তাল্লিশ বছর পরে শেখ কামালের জন্মদিন পালন উপলক্ষে অতিমাত্রায় উচ্ছ্বাস ও আনুষ্ঠানিকতায় ঔজ্জ্বল্যে নিজেদের গৌরবান্বিত করতে শহীদ শেখ কামালের স্বতঃস্ফূর্ত ঔজ্জ্বল্য যেন ম্লান না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে উদ্দেশ করে অপপ্রচার চালিয়েছে পাকিস্তানপন্থী দলগুলো। তাদের অপপ্রচারে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বা সংস্কৃতি অনেক সময়েই মানা হতো না। জুলফিকার আলী ভুট্টো শিষ্টাচার বহির্ভূত অশোভন ও মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর বংশ পরিচয় সম্বন্ধে। এটা ’৬৯-৭০ সালের কথা। পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় এই খবর প্রকাশিতও হয়েছিল (তথ্য সূত্র: আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী)। তথাকথিত শিক্ষিত স্মার্ট ভুট্টোর পক্ষেই এ ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ সম্ভব। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ভুট্টোর আরও অনেক তথ্যের প্রসঙ্গও দেয়া যেতে পারে। যেমন: ভুট্টো বলেছিল শেখ মুজিব বলেছেন, ‘ঢাকায় পাকিস্তানের রাজধানী স্থানান্তরিত হলে তিনি ছয় দফা ছেড়ে দেবেন’ এমন আরও উদাহরণ দেয়া যাবে। ভুট্টোর মতোই এই দেশের পাকিস্তানপন্থী ফকা চৌধুরী, সবুর খান, অলি আহাদ, ওয়াহিদুজ্জামান ঠাণ্ডা মিয়া, মৌলভি ফরিদ আহমেদ গংরাও কি কোন অংশে কম ছিল? বিশেষ করে ’৭০-এর নির্বাচনের আগে যে সব শব্দ প্রয়োগে তারা নির্বাচনী প্রচারণা করেছে তা মোটেও শোভন ছিল না। চলবে…

লেখক : আহ্বায়ক, সম্প্রীতি বাংলাদেশ


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.