শুভ বড়দিন

সংবাদ পাতা
শেয়ার করুন

পীযূষ বন্দোপাধ্যায়, আহ্বায়ক, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ।

আজকের এই পূর্ণ্যদিনে সবাইকে প্রীতি, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাই।  প্রভু যীশু ক্ষমা , প্রেম ও প্রীতির বানী প্রচার করেছেন জীবনভর । মানব সমাজের উদ্দেশ্যে বলেছেন বিশ্বের প্রতিপালক যিনি তিনিই সকলের পিতা, জগতের আয় সকলেই তাঁর সন্তান । তিনি আঘাতের প্রতিদানে আঘাত না করে অপরাধীকে ক্ষমা করার কথা বলেছেন । পরবর্তীকালে এবং সমকালে এই কথার গুরুত্ব ও মর্মার্থ কতটুকু বা কে বহন করে ! তাতে অবশ্য জগতের কিছুই এসে যায়নি । জগৎ টিকে আছে আপন মহিমায়, সমাজও বেঁচে থাকে আর আমাদের রবীন্দ্রনাথ লেখেন অন্তরের বিদ্বেষ বিষ বিনাশ করার পঙক্তি ।

প্রভু যীশুর জীবৎকালের আগে-পরে কেউ কেউ জগৎ ও সমাজকে অসার বলার চেষ্টা করেছেন । যীশু কিন্তু জগৎ ও সমাজকে অসার বা মিথ্যে বলে স্বীকার করেননি । সামাজিক কর্তব্য, দায়িত্ব এবং সচেতনতাকে তিনি খুব বড় করে দেখেছেন । পাশ্চাত্যের রমরমা চেহারা তো এই দর্শনের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে এবং টিকে আছে । পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রব্যাবস্থা, স্থাপত্য, শিল্পকলা, ব্যাবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সমাজ এবং সমাজের প্রাণীকুলের জীবনাচার ও বন্ধন ইত্যাদি বিষয়গুলো তো যীশুর ধর্ম দর্শনের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনের ওপরেই দাঁড়িয়ে । ভালো-মন্দ বিচারে না গিয়ে আবারো বলি প্রভু যীশু যদি জগৎ সংসারকে অসার বা মিথ্যে বলে বিশ্বাস করতেন তা হলে কি শত সহস্র বছর ধরে একটি সভ্যতা গড়ে উঠত বা টিকে থাকতো ! জানি যে সেখানে গোঁড়ামি আছে, কুসংস্কার আছে, বিভাজনও আছে । এ’সবই মনুষ্য সৃষ্ট । সভ্যতা গড়ে উঠবে অথচ সংকট সৃষ্টি হবে না তা কি করে হয় । তবে বাস্তবতা এই যে সংকট সৃষ্টি হয় অবিবেচক ও আপাত মূর্খের হাতে ।  ধর্ম বিশ্বাস এবং আচরণে যদি ফারাক থাকে, যদি চিন্তার দারিদ্র থাকে, যদি মনের সংকীর্নতা বা দীনতা থাকে তবে আর সংকটের অন্য কোন কারণ খোঁজার খুব বেশী প্রয়োজন হয় না । সংকটের আরও কারণ অবশ্য আছে । লোভ-লালসা, আধিপত্য বিস্তারের জন্য বল প্রয়োগ এবং নিজ শ্রেষ্টত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কুট কৌশল এ সব বিষয়গুলোকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না । বিগত শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া  দুই দুইটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধের দৃষ্টান্ত এ ক্ষেত্রে স্মরণ করাতেই হয় । যার ক্ষতিকর প্রভাবে আজও বিপর্যস্ত গোটা বিশ্ব ।  প্রভু যীশুর পবিত্র দর্শন তখন মনুষ্য সৃষ্ট এহেন সংকটে যেন নীরবে নিভৃতে কাঁদে ।

তবুও সকল সংকটের গিরি-খাদ ডিঙিয়ে, দুঃখের সাগর পেরিয়ে বছর ঘুরে আবার এসেছে বড়দিনের পুণ্য উৎসব । আর উৎসব মানেই হৈ হুলোর, আনন্দ ফূর্তি, নৃত্যগীত, খানাপিনা । সেই সাথে ভালোবাসার ভাগাভাগি, উপহার বিনিময় , আত্মীয় এবং বন্ধুদের নিয়ে অফুরন্ত নির্ভেজাল আড্ডা । বড়দিনের আনন্দ উৎসবে শিশু-কিশোরের  বেহিসেবী হুটোপুটি, সারাটা সময় কেবল কলকল খলখল । অন্যান্য ধর্মালম্বিদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের মত বড়দিনের উৎসবের চরিত্র মূলত একই । তবে বড়দিনের উৎসব আনন্দে ক্রীস্টমাস গাছ এবং শুভ্রকেশী সান্তাক্লজ একটা ভিন্ন আমেজ ও চরিত্র নিয়ে উপস্থিত হয় । আবাল বৃদ্ধ বনিতার কাছে আমি নিশ্চিত, এসবের একটা আলাদা মর্যাদা ও তাৎপর্য আছে ।

নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, সিডনিসহ বিশ্বের উন্নত ও আধুনিক নগরীতে বড়দিন পালনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে অনেক দিন আগে থেকেই । শপিংমল, দোকানপাট, রাস্তাঘাট সব জায়গা আলোয় আলোকময় । একেবারে ছোট আকৃতি থেকে বিশাল বিশাল আকৃতির ক্রীস্টমাস গাছ বিক্রির ধূম লেগেছে যেন । যে যার সামর্থ ও সুবিধানুযায়ী তা কিনে ঘরে ফিরছে । শপিংমল আর বিপণীগুলোতে মূল্যহ্রাসের প্রতিযোগিতা আর উপচে পড়া ভীড় । প্রচন্ড শীত উপেক্ষা করে নগরীর পার্কগুলোতে আলোর রোশনাইয়ের ভেতর গানবাজনা, মিউজিক কনসার্ট, পানাহার, আনন্দ উল্লাস মধ্যরাত পর্যন্ত । শুক্র আর শনিতে প্রায় শেষ রাত অবধি । ক্রিস্টমাস বা বড়দিনকে ঘিরে পাশ্চাত্য নগরীগুলোতে যে কল্পনাতীত উন্মাদনা তা চাক্ষুষ না করলে বিশ্বাস হবে না । দেখলে দেহমনে একটা স্বতস্ফুর্ত নাচন লাগে । আসলে উৎসব আনন্দের একটা গোপন ইশারা থাকে যা চোখে দেখা যায় না , অন্তরের গভীরে নাড়া দেয় । এটাই বুঝি অন্তরের টান ! ধর্মের বিভাজনে আনন্দোৎসবে আহ্বান কখনো হোঁচট খায় বলে মনে হয় না । ধর্মের বিভাজন সেখানে গৌণ হয়ে যায় ।

আমাদের দেশেও যখন শারদীয় দূর্গোৎসবে ঢাকের বোল বেজে ওঠে তখন ধর্মের বিভাজন ভুলে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয় অনেকেই । প্রবারনা পূর্ণিমার সন্ধ্যায় যখন পূণ্যবার্তা নিয়ে ফানুসগুলো দূর আকাশে আলোক বর্তিকা হয়ে তারার মত উজ্জ্বল হয় তখন তা দেখে যে আনন্দ আমরা পাই সেখানে সবাই কি বৌদ্ধ ধর্মালম্বী ! অথবা দুই ঈদের পবিত্র উৎসবে আকর্ষণীয় পোশাকে পাড়া মহল্লার প্রতিবেশীর বাড়িতে সেমাই-হালুয়ার স্বাদ নিতে যে অতিথিরা আসে তারা কি শুধুই মুসলমান ! আমি অন্তত কখনোই তা মনে করিনা । দেখিওনি । বাংলাদেশের সংস্কৃতি আসলে এমনই । শত শত বছর ধরে এই ছোট্ট ভূখন্ডে আমরা একি বাগিচায় নানা পরিচয়ের ফুল হয়ে ফুটে থেকে বাগিচার শোভা বাড়াই । কেউ মুসলমান, কেউ হিন্দু, কেউ খ্রীস্টান, কেউ বৌদ্ধ, কেউ চাকমা-সাওতাল-গারো ইত্যাদি । এটাই এই ভূখন্ডের সর্ব ধর্মের সম্প্রীতির বৈশিষ্ট ও সৌন্দর্য । পৃথিবীতে এ’রকম উদাহরণ খুব কম অঞ্চলেই আছে বলে মনে হয় । তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বলেন “ধর্ম যার যার উৎসব সবার” তখন তাকে শুধু কথার কথা মনে হয় না । এই সহজ কথার ভেতর গভীর ব্যাঞ্জনা আছে । ইতিহাস- ঐতিহ্য – সংস্কৃতির নির্ভেজাল সত্য আছে । আমাদের সংগঠন “সম্প্রীতি বাংলাদেশ” এই সহজ কথাটিকে ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস করে নিয়ত কাজ করছে ।

স্বল্প জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি যে জাতির সকল সংকটে এদেশে বসবাসকারী সর্বধর্মের নাগরিকগন ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংকট কাটানোর চেষ্টা করে । পাশাপাশি জাতির সকল অর্জনের আনন্দ ভাগাভাগি করে একত্রে উল্লাসও করে সর্ব ধর্মের নাগরিক । ধর্মীয় কুসংস্কার কিংবা ধর্মের চটুল ব্যাখ্যা দিয়ে কখনো কখনো ধর্মান্ধের দল সহজ মানুষদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে সত্য, কিন্তু তা ধোপে টেকে না । জলের ধর্ম যেমন জলের দিকে যাওয়া তেমনি মানুষের ধর্ম সংকটে কিংবা উল্লাসে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো । এটা ঐতিহাসিক সত্য । এটাই এই ভূখন্ডের বহমান সংস্কৃতি ।

এ’ দেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মালম্বি মুললমান । সংখ্যা অনুপাতে খ্রীস্টান ধর্মালম্বির সংখ্যা তুলনায় খুবই কম। তাই বলে সংকটের কালে সবাই যখন বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় তখন কি সংখ্যানুপাতের হিসাব কেউ মনে রাখে? মুসলমান – হিন্দু-বৌদ্ধ – খ্রীস্টান সকলে সমচেতনায় সমান সাহসে এগিয়ে আসে না কি? নিকট অতীতে আটচল্লিশ বছর আগে মহান মুক্তিযুদ্ধে বর্বরতার বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধ এবং প্রত্যাঘাতে সর্বধর্মের নাগরিক সম্মিলিত হয়ে যে সাহসী ভুমিকা রেখেছিল তা ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত । আমাদের বিজয়ও এসেছিল মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ- খ্রীস্তান ধর্মালম্বিদের মিলিত রক্তস্রোতের ভেতর । স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের মূল চারটি স্তম্ভের ভেতর ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংযুক্ত করে জাতির পিতা আবহমান বাংলার ঐতিহাসিক একটি সত্যকেই আনুষ্ঠানিকভাবে চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিলেন । তিনি বিশ্বাস করতেন যে স্বাধীন বাংলাদেশে যে যার ধর্ম পালন করবে কিন্তু রাষ্ট্রের অধিকারে সবার থাকবে সমান অধিকার ।

পরবর্তীকালে আবহমান বাংলার চেতনা বিনাশী নষ্ট রাজনীতিকদের হীন ষড়যন্ত্র এবং ধর্মান্ধ উগ্রবাদের বর্বর আস্ফালন আমাদের স্বতস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক অগ্রযাত্রায় ছন্দপতন ঘটায় । সুযোগ পেলেই এখনো বিষাক্ত নিঃশ্বাস ফেলে নাগিনিরা । রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতাতেও ঘটানো হয়েছে অনেক অনাকাংখিত অঘটন । বানিয়ার চরের গীর্জাতে বর্বর বোমা হামলায় প্রমাণিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রসী একটি চক্র-এর সঙ্গে জড়িত ছিল ।

সবশেষে বলি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস মিলন আর সম্প্রীতির ইতিহাস । ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতার সেখানে স্থান নাই । ভূলে গেলে চলবে না যে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পুন্যতীরে বাংলার এই মাটি তার শ্যামল বুকে চিরকাল সম্প্রীতিকে ধারন করে এসেছে, পরিচর্যা করেছে গভীর ভালোবাসায় । আমাদের হৃদয় চিরকালই সিক্ত সহমর্মিতা, করুণা, প্রেম, প্রীতি আর সম্প্রীতির অনিঃশেষ ধারায় । কামনা করি ঐতিহাসিক সত্যের এই শুভবাদী দর্শনে কখনো যেন ছন্দপতন না ঘটে । প্রার্থনা করি সম্প্রীতির বিনিসুতোর এক নিশ্ছিদ্র বন্ধনে আমরা যেন আবদ্ধ থাকি আজীবন, একই বাগিচায় নানা পরিচয়ের ফুল হয়ে ।

মঙ্গল হউক ।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.