মঙ্গল শোভাযাত্রা: শান্তির পক্ষে,অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • তাপস হালদার

১.
বাংলা নববর্ষের প্রধান অনুসঙ্গ হয়ে উঠেছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে মঙ্গল শোভাযাত্রা পেয়েছে সার্বজনীনতা। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউনেস্কো কমিটি এ প্রসঙ্গে বলেছে, ‘এই মঙ্গল শোভাযাত্রা বাংলাদেশের মানুষের সাহস আর অশুভের বিরুদ্ধে গর্বিত লড়াই। ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক’।

মঙ্গল শোভাযাত্রা ১৯৮৯ সালে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে প্রথম শুরু হয়।তারপর পর থেকে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের প্রধান আকর্ষণে পরিনত হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ(সাবেক চারুকলা ইনস্টিটিউট) বরাবরের মতই মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করে থাকে।পহেলা বৈশাখের ভোরে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার চারুকলায় ফিরে আসে।শোভাযাত্রায় রং-বেরঙের মুখোশ আর বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি দিয়ে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি যেমনি তুলে ধরা হয়, ঠিক তেমনি প্রতি বছর একটি ‘থিম’ বেছে নেয়া হয়, যা শান্তির পক্ষে, অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের আয়োজনে এনে দিয়েছে ভিন্ন এক মাত্রা। হাজার হাজার মানুষ প্রাণের টানে শোভাযাত্রায় শামিল হন। শোভাযাত্রা থেকে সাম্প্রদায়িকতা,ধর্মান্ধতা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরে অশুভ শক্তির বিনাশ ও সত্য সুন্দরের প্রার্থণা করা হয়। ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতির পর মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন আর রাজধানী ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, জেলা উপজেলা পর্যায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৭ সাল থেকে ওপার বাংলার কলকাতায়ও মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। কলকাতার গাঙ্গুলি বাগান থেকে শুরু হয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে শোভাযাত্রা শেষ হয়।

মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্টী গুলো ধর্মের দোহাই দিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বানচাল করতে চায়। অথচ এর সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা জন্মাষ্টমীতেও যেমন শোভাযাত্রা করে থাকে, ঠিক মুসলিমদেরও একটি অংশ মহরমে শোভাযাত্রা করে, যা সম্পূর্ণরূপে ধর্মের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা সার্বজনীন।যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণের মানুষ একসাথে মিলিত হন।

২.
নববর্ষ বাঙালির একটি সর্বজনীন উৎসব।বাঙালি হিসেবে এই একটি মাত্র উৎসব যা বাংলা ভাষাভাষি পৃথিবীর সকল বাঙালিরা পালন করে থাকে। পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাভিত্তিক জাতির নিজস্ব সার্বজনীন উৎসব আছে।চীনাদের ‘চীনা নববর্ষ’,ইরান থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত ‘নওরোজ’,ইংরেজি ভাষাভাষীদের ‘ইংরেজি নববর্ষ’, ঠিক তেমনই পয়লা বৈশাখ বাংলা ভাষাভাষীদের সার্বজনীন উৎসব।প্রত্যেক জাতির বর্ষ গণনা যেমন এক নয়, ঠিক তেমনি তাদের নববর্ষেও আছে ভিন্নতা।

ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে এ অঞ্চলের মানুষ প্রথম ঐক্যবন্ধ হয়েছিল। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন ও রবীন্দ্র সংগীত প্রচারে বাধা প্রদান করে আইয়ুব খানের সরকার। প্রতিবাদে বাঙালি বুদ্ধিজীবিরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে।তৈরি হয় ছায়ানট নামে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। ১৯৬৭ সালে ছায়ানটই রমনার খোলা মঞ্চে প্রথম বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু করে, যা আজকে বাঙালির ঐতিয্যের প্রতীকে পরিনত হয়েছে। যে রবীন্দ্র সংগীতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সেই রবীন্দ্র সংগীত ‘এসো হে বৈশাখ,এসো এসো’ গানের মধ্য দিয়েই প্রতিবারই নববর্ষকে স্বাগত জানানো হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সাল বাংলা ১৩৭৯ সন থেকে ‘বাংলা নববর্ষ’ জাতীয় উৎসব হিসেবে পালন হয়ে আসছে। কিন্তু ২০০১ সাল বাংলা ১৪০৮ সনের পহেলা বৈশাখ রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে হামলা করে মৌলবাদীরা বাংলার সংস্কৃতিকে ধংস করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু অজেয় বাঙালি সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখে দিতে আরো ব্যাপক ভাবে পহেলা বৈশাখের চেতনা সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়।এখন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান শুধুমাত্র রমনার বটমূল কিংবা শহর কেন্দ্রীকই সীমাবন্ধ নয়, এটি গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।এছাড়াও বিশ্বের যেখানেই বাঙালিরা আছে সেখানেই আড়ম্বর ভাবে বাংলা বর্ষবরণ উদযাপন করে বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরা হচ্ছে।

বাঙালি জাতির জীবনে বাংলা নববর্ষ অন্যতম অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন উৎসব।বাঙালির সম্প্রীতির দিন, বাঙালির মহামিলনের দিন। এ দিন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিষেসে সকলেই বিগত বছরের দুঃখ-কষ্ট, মলিনতা, ব্যর্থতাকে ভুলে নবপ্রাণে জেগে ওঠে।

সাম্প্রদায়িক শক্তি এখনও বাংলার সংস্কৃতি নববর্ষ কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মেনে নিতে পারে না। ধর্মান্ধ, মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্টী এখনও হুমকি ধামকি দিয়ে বৈশাখী অনুষ্ঠানকে বানচাল করতে চায়। ধর্মের দোহাই দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা উস্কে দিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যেহেতু বাঙালিয়ানাকে ধারণ ও লালন করে সেজন্যই উগ্রবাদীরা সফল হতে পারে না। পহেলা বৈশাখ শুধুমাত্র আমাদের আনন্দ উৎসবের অনুষ্ঠানই নয়, এটি প্রতিবাদের ভাষাও। সেদিন প্রতিবাদ করেছিল পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে, আজও প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। সকল অপশক্তি দূর হয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে উঠুক, মঙ্গল শোভাযাত্রায় এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। নতুন বছর সবার জীবনে সুখ শান্তি সমৃদ্ধির বয়ে আনুক, সেই শুভ প্রত্যাশা করি। শুভ নববর্ষ।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

প্রকাশকাল: ১২ এপ্রিল ২০২২, বাহান্ন নিউজ।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.