বিদেশি গণমাধ্যমে মুজিব হত্যার সংবাদ

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • মোস্তফা হোসেইন

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের খবর তাত্ক্ষণিক গণমাধ্যমে প্রকাশের প্রতিবন্ধকতা ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পর দেশীয় গণমাধ্যমের প্রকাশ ও প্রচারণা চলে যায় খুনিদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। ফলে ১৫ তারিখে বঙ্গবন্ধুর খুন হওয়ার সংবাদ তেমন একটা প্রকাশ হয়েছে এমনটা চোখে পড়েনি। কিন্তু ১৬ আগস্ট থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বিদেশি গণমাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ড বিষয়ে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন, মন্তব্য কলাম প্রকাশ হতে থাকে।

বোধকরি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারকাজে সবচেয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে ১৫ আগস্ট-পরবর্তী বিদেশি গণমাধ্যম।
১৭ আগস্ট ভারতীয় পত্রিকাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বসহ সংবাদ প্রকাশ করে। ইউরোপ-আমেরিকার পত্রিকাগুলোর মধ্যে গার্ডিয়ান ২৮ আগস্ট যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে, মনে হয় এটি অধিকতর বিস্তারিত বিবরণসহ। প্রতিবেদক ছিলেন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ ও মার্টিন উলাকট। অনেক তথ্যসমৃদ্ধ ছিল প্রতিবেদনটি।

 

সিআইএর ভূমিকা

১৯৭৯ সালের ১৫ আগস্ট লিফশুলজ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পেছনের ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয় প্রকাশ করেন তাঁর লেখায়। গার্ডিয়ানেই প্রকাশিত হয় ওই লেখাটি। তিনি উল্লেখ করেন, ‘ঢাকায় আমেরিকান দূতাবাসে কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তা এবং বিস্তারিত জানা বাঙালি কিছু সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য ঘটানো সেনা অভ্যুত্থান সম্পর্কে জানত। এমনকি আমেরিকান দূতাবাসের কয়েকজন কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের ছয় মাসেরও বেশি সময় আগে বিদ্রোহ পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনায় বসেছেন। ’

৬ নভেম্বর ১৯৭৫ ব্যাঙ্কক ওয়ার্ল্ড-এ প্রকাশিত ফারুক রহমানের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন থেকেও বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের রক্ষাকারী এবং আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করত। সংগত কারণেই মনে করা যায় খুনিদের সংযোগ ছিল পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। ব্যাংকক ওয়ার্ল্ডে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘ফারুক রহমান জানান, ব্যাংককে পৌঁছানোর পরই তাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান দূতাবাসে তাঁদের উপস্থিতির খবর জানিয়ে দিয়েছেন এবং ওই দুটি দেশে তাঁরা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করবেন। ’

ভারতীয় পত্রিকায়ও সিআইএ সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট কলকাতায় মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের সামনে বিক্ষোভ হয়। ভারতীয় পত্রপত্রিকা সংবাদটি অত্যন্ত গুরুত্বসহ প্রকাশ করে। এরপর ভারত সফরে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর টমাস এফ ইগলটন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সিনেটরকে বলেন, ব্লিত্জ পত্রিকায় বঙ্গবন্ধু হত্যায় সিআইএর সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি চাঞ্চল্যকর। একই বছর ২৩ আগস্ট পত্রিকাটি শিরোনাম করেছে, ‘বাংলাদেশে সিআইএ আঘাত হেনেছে। ’

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা আট কলাম সংবাদ করে মুজিব হত্যাকাণ্ড বিষয়ে। তাদের পরিবেশিত সংবাদে জানা যায়, ‘বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের খবর প্রথম বিশ্ববাসীকে জানায় ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস। এরপর সকাল ৮টায় প্রথম খবর দিল রেডিও বাংলাদেশ। ’ এরপর পিটিআইয়ের ঢাকা ব্যুরো রেডিও বাংলাদেশের উদ্ধৃতি দিয়ে মুজিব হত্যাকাণ্ডের খবর প্রচার করে।

খুনিরা যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্রয়স্থল হিসেবে মনে করত তার আরেকটি তথ্য পাওয়া যায় ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে ব্যাঙ্কক পোস্টে প্রকাশিত সংবাদ থেকে। তারা লিখেছে, ‘জনৈক মার্কিন মুখপত্র জানিয়েছে, ফারুক আজ (৬ নভেম্বর) মার্কিন কনস্যুলেটে আসেন এবং তার ও আরো ১৬ জন অফিসারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করেন। ’

 

সদম্ভে খুনের দায় স্বীকার

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে আমেরিকার ভূমিকার বিষয়টি যেমন পত্রিকা মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে তেমনি খুনিদের স্বীকারোক্তিগুলোও আমরা গণমাধ্যম থেকেই জানতে পেরেছি। তাও বিদেশি পত্রিকা ও টেলিভিশন মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুক রহমানের স্বীকারোক্তিমূলক সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে একাধিক বিদেশি পত্রিকায়। রয়টার্সের বরাত দিয়ে ব্যাঙ্কক ওয়ার্ল্ড ৫ নভেম্বর ১৯৭৫ উল্লেখ করা হয়, সাংবাদিকের প্রশ্ন—শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার জন্য আপনি কি অনুতপ্ত?

সৈয়দ ফারুক রহমান—না। তার জন্য অনুতপ্ত নই। … ওদের (নিহত প্রেসিডেন্ট ও তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী) সরিয়ে দেওয়াই প্রয়োজন ছিল।

দ্য ভয়েস অব দ্য ন্যাশন পত্রিকায় ফারুক রহমানকে উদ্ধৃত করে উল্লেখ করেছে, ‘আমিই শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলাম। কারণ এটাই ছিল একমাত্র পথ। ’ ব্যাঙ্ককই শুধু নয়, বিভিন্ন দেশ বঙ্গবন্ধু হত্যার সংবাদ প্রকাশ করে বিভিন্ন গণমাধ্যম।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ভারতের প্রতিটি পত্রিকা ১৭ আগস্ট থেকেই সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে। ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়া, স্টেটসম্যান কিংবা প্রভাবশালী বাংলা আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর ওই দিন অত্যন্ত গুরুত্বসহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পরিবেশন করে।

১৭ আগস্ট আনন্দবাজার পত্রিকার বিশেষ সংবাদ পরিবেশনায় আকর্ষণীয় একটি নিবন্ধ প্রকাশ হয়। নিবন্ধের শিরোনাম ছিল, শেখ কথা ছিল শেষকথা। নিবন্ধকার শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন অনেক দিন। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণামূলক লেখাটির শেষাংশে তিনি লিখেন, ‘যেকোনো জনসভায় যেকোনো ঘোষণার সময়, যেকোনো হুকুম দেওয়ার সময় শেখ বলতেন: আমি শেখ মুজিবুর রহমান বলছি…। শেখ মনে করতেন বাংলাদেশ এইটাই শেষ কথা। শুক্রবার ভোর সাড়ে চারটায় বাংলাদেশের কয়েকজন তরুণ সামরিক অফিসার ঘোষণা করলেন। না, ওটাই শেষ কথা নয়। ’

লেখক: সাংবাদিক
প্রকাশকাল: ১৫ আগস্ট ২০২২, কালের কণ্ঠ


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.