বিতর্ক ও ফলপ্রসূ কূটনীতি

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪, লাহোর ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যাওয়া ও বাংলাদেশের ওআইসি সদস্য পদপ্রাপ্তির মতো মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনার চারটি মাত্রা আছে। এক. লাহোর যাওয়া বঙ্গবন্ধুকে দেশে বিতর্কের মুখে ফেলেছিল; এমনকি তাঁর স্ত্রী প্রিয় রেণুর সঙ্গেও মতান্তর হয়েছিল। দুই. বাংলাদেশের ওআইসির মতো একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে সংযোজন হয়েছিল অনেক কিছু। তিন. মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বৈরী মুসলিম বিশ্বকে বঙ্গবন্ধু বন্ধুতে পরিণত করেন।

চার. বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা সুদূরপ্রসারী সুফল বয়ে এনেছিল। কারণ বাংলাদেশের স্বীকৃতি ও পেট্রোডলার সাহায্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয়, যা অতি প্রয়োজনীয় ছিল।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুসলিম বিশ্বের যে ভূমিকা ছিল তা যেমন একাধারে বাংলাদেশবিরোধী, তেমনি পাকিস্তানের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনমূলক। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টিতে এ মুক্তিযুদ্ধ ইসলামবিরোধী অপপ্রয়াস হিসেবে এবং ইসলামী সংহতির প্রতি হুমকি হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছিল। ১৯৭১-এ ২২ সদস্যবিশিষ্ট ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ঙওঈ) জেদ্দা অধিবেশন ‘জাতীয় সংহতি ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায়’ পাকিস্তানের ‘ন্যায়সংগত’ প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানায়। এ সময় মিসরের ভূমিকা ছিল বেশ কৌতূহলোদ্দীপক এবং কূটনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত; তার দৃষ্টিতে পূর্ব পাকিস্তান সমস্যা সঠিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়নি। মার্কিন কংগ্রেসের পক্ষে বিধি-নিষেধ আরোপিত হওয়ার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানের পক্ষে সরাসরি অস্ত্র পাওয়া অসম্ভব হয়ে ওঠে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে কতিপয় আরব রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাকিস্তানি সামরিকচক্রকে বাংলাদেশে গণহত্যায় উৎসাহিত করে।

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গড়ে ওঠার ইতিহাসে লাহোর ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ঙওঈ) শীর্ষ বৈঠক একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বৈঠক শুরু হওয়ার বেশ আগে থেকেই যে বিতর্ক জমে উঠেছিল তা হলো—বাংলাদেশকে এই সংস্থার সদস্য করে নেওয়া সমীচীন হবে কি না। অথচ ১৯৭৪-এর মধ্যে কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্রসহ বিশ্বের ১১৬টি রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জানিয়েছিল। কাজেই বাংলাদেশকে সদস্য না করার ব্যাপারটা বেশ অযৌক্তিক ছিল। এ সময়ে বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্য সংস্থার কর্মকর্তাদের বেশ বিব্রত করেছিল। তাঁর বক্তব্য ছিল: ‘যদিও আমাদের শতকরা আশি ভাগ জনগণ মুসলমান এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অধিবাসী, তবু আমরা ইসলামী শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে আগ্রহী। ’ তবে তিনি একটি শর্ত আরোপ করেছিলেন: ‘পাকিস্তান স্বীকৃতি দিলেই বাংলাদেশ বৈঠকে যোগ দেবে, নইলে নয়। ’ বাংলাদেশের এ শর্ত সম্মেলন-কর্মকর্তাদের মধ্যে বিতর্ক ও কূটনৈতিক তৎপরতার সূচনা করে। সে মুহূর্তে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। এ সময় পাকিস্তানের বিশেষ অনুরোধে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে রাজি হন। কায়রোয় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমেদ ও বাংলাদেশের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১২ ফেব্রুয়ারি পৃথক পৃথকভাবে আনোয়ার সাদাতের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। কিন্তু আনোয়ার সাদাতের এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। কারণ পাকিস্তানের স্বীকৃতি ছাড়া বাংলাদেশ লাহোর যেতে অসম্মতি জানায়। সুতরাং পাকিস্তানকেই একটু নমনীয় হতে দেখা যায়। ১৬ ফেব্রুয়ারি সে স্বীকৃতি দিতে রাজি হয়। তবে একটি শর্তে। শর্তটি হলো, ভারতে আটক ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দির কোনো বিচার করা হবে না, এ মর্মে নিশ্চয়তা দিতে হবে। বাংলাদেশ এ নিশ্চয়তা দিতে রাজি ছিল না। কাজেই নতুন সংকটের সৃষ্টি হলো। ২০ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে সোমালিয়ার প্রস্তাব অনুসারে ঢাকায় একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়। এ প্রতিনিধিদল ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে আলোচনায় সন্তোষজনক অগ্রগতি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। একই দিন বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে ‘পাকিস্তানের স্বীকৃতির অর্থ এই নয় যে যুদ্ধবন্দির বিচার না করার শর্ত মেনে নেওয়া হয়েছে। ’ ২৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু ২২ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে লাহোর যান।

তবে বঙ্গবন্ধুর এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে বঙ্গমাতার জোরালো দ্বিমত ছিল। তিনি শেখ ফজলুল হক মনিকে তাঁর দ্বিমতের সপক্ষে দুটো যুক্তি দিয়েছিলেন। এক. বঙ্গবন্ধু লাহোরে গেলে রাষ্ট্রাচার হিসেবে ভুট্টোকে ফিরতি সফরের আমন্ত্রণ জানাতে হবে। ভুট্টো ঢাকায় এসে বাংলাদেশবিরোধী পাকিস্তানপন্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ দৃঢ় করবে। দুই. পাকিস্তানে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস না থাকায় বঙ্গবন্ধুর দেখভাল করবে পাকিস্তান, যা বিপজ্জনক। বঙ্গমাতার কোনো সন্দেহ অমূলক ছিল না। ভুট্টো বাংলাদেশে এসে ঠিক সে কাজটি করেছিলেন, যার কথা বঙ্গমাতা আগেই বলে দিয়েছিলেন। আর বঙ্গবন্ধু লাহোর থেকে ফেরার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন; তাঁকে মস্কো যেতে হয় চিকিৎসার জন্য। তবে বঙ্গমাতা বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সর্বজ্যেষ্ঠ মন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম যাবেন। উল্লেখ্য, ২২ মার্চ মন্ত্রিসভার বৈঠকে তাজউদ্দীন আহমদও অভিন্ন মত পোষণ করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু লাহোর যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাল্টালেন না দুটো কারণে। এক. সৌদি বাদশাহ ফয়সাল অনুরোধ জানিয়ে তারবার্তা পাঠিয়েছেন। দুই. আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ারি বুমেদিন তাঁর প্রেসিডেনশিয়াল প্লেন ঢাকায় পাঠিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকে লাহোর নেওয়ার জন্য। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল, ‘…আমার লাহোর যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করা সমীচীন হবে না। ’ বলা চলে, যুক্তি ও পরিস্থিতির বিচারে উভয় পক্ষই সঠিক ছিল। তবে বঙ্গবন্ধুর ওপর পরিস্থিতির চাপটা বেশি ছিল; সুতরাং তাঁর এমন সিদ্ধান্ত।

লাহোর সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ও মুসলিম বিশ্বের সক্রিয় সদস্য হিসেবে বিবেচিত হয়। সার্বিক বিচারে বলা যেতে পারে, ১৯৭৪ ছিল বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সাফল্যের বছর। কারণ একই বছর বাংলাদেশ জাতিসংঘেরও সদস্য হয়। মুসলিম বিশ্বে নিজের স্থান করে নিতে যেমন পাকিস্তানের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়, তেমনি জাতিসংঘে মোকাবেলা করতে হয়েছিল চীনের বিরোধিতা।

লেখক : চেয়ার অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চেয়ার, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)
প্রকাশকাল: ১৫ আগস্ট ২০২২, কালের কণ্ঠ


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.