বিএনপির ‘জাতীয় সরকার’, মুলা দেখানো শুভঙ্করের ফাঁকি

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • তাপস হালদার

 

সাম্প্রতিক কালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টে জাতীয় সরকার বিষয়টি নিয়ে খুব শোরগোল দেখা যাচ্ছে। তাদের কেউ বলছে আগামী নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার চাই, আবার বিএনপি বলছে ভিন্ন কথা- তারা জয়ী হলে নির্বাচনের পরে জাতীয় সরকার গঠন করবে।

এ বিষয়ে লেখার শুরুতে একটি গল্প মনে পড়ছে। যদিও গল্পটি সবারই জানা। গাধার সামনে মূলা ঝোলানো। মরুভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে গাধা ক্লান্ত হয়ে যায়, আর হাঁটতে চায় না। তখন মালিক গাধাকে লোভ দেখানোর জন্য একটা লম্বা বাঁশের মাথায় মুলা ঝুলিয়ে রাখে এবং বাঁশের অপর প্রান্ত গাধার শরীরের সঙ্গে এমনভাবে বেঁধে দেয় যেনো মুলাটা গাধার চোখের সামনেই ঝুলতে থাকে। তখন ওই মুলা খাওয়ার লোভে গাধা সামনে হাঁটতে থাকে, এবং ভাবে আর একটু হাঁটলে বোধহয় মুলার নাগাল পাওয়া যাবে। কিন্তু গাধার সাধ আর মিটে না। পথ ফুরিয়ে যায় কিন্তু মুলা আর কাছে আসে না।

আগামী নির্বাচনে বিএনপি তার শরিকদের সামনে জাতীয় সরকারের মুলা ঝুলিয়েছে। গত ২৮ মার্চ লন্ডনে এক আলোচনা সভায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি তারেক রহমান ‘জাতীয় সরকারের’ রূপরেখা তুলে ধরে বলেছেন, যারা নির্বাচনে জিতবে, যারা জিতবে না তাদের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। অথচ বিএনপি ও শরিক জোটের নেতারা এতদিন ধরে বলে আসছিল নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকারের কথা। তারেক রহমানের ঘোষণার পর বিএনপি নেতারা ভোল বদল শুরু করেছে।

বিএনপি তাদের জোট ধরে রাখতে নতুন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। বিএনপির সঙ্গে যারা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে থাকবে তাদের নতুন টোপ দেওয়া হয়েছে যে, তাদের নিয়েই পরবর্তীতে সরকার গঠন করা হবে। বিএনপির হাতে আগামী নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী কিংবা দলের মুখ করার মতো কোনো লোক নেই। বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত। প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা তিনি নির্বাচনে প্রার্থীই হতে পারবেন না। অন্যদিকে তারেক রহমান যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়ে লন্ডনে পলাতক আছেন। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি আছে। তিনিও প্রার্থী হতে পারবেন না। গ্রহণযোগ্য কোনো প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী না থাকায় নির্বাচনের পর জাতীয় সরকারের মুলা ঝুলিয়েছে বিএনপি। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও যেমন কৌতুক সৃষ্টি হয়েছে তেমনি শরিকদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে দ্বিধাবিভক্তি।

বিএনপি যে পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ করবে তার ভিত্তি কী? এজন্যই বিএনপির বুদ্ধিজীবি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও জোট নেতা আ স ম আবদুর রব নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকারের দাবি তুলেছে। তাদের ধারণা বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তার চেয়ে যদি নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার হয় তাহলে হয়তো হালুয়া-রুটির ভাগ পেলেও পেতে পারি।

অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্ব কিন্তু ভালো করেই জানে, নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার হলে নিশ্চিতভাবে সে সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাই হবেন। কারণ এ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়ে গ্রহণযোগ্য কোনো নেতা বাংলাদেশে নেই এবং সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে তিনিই দায়িত্ব পাবেন। সেখানে বিএনপি মনে করে তাদের কোনো লাভ থাকবে না, সেজন্যই তারা জোট ধরে রাখতে নির্বাচন পরবর্তী জাতীয় সরকারের কথা বলছে।

প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল দলের অংশগ্রহণে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকারের আহ্বান জানিয়েছিল। এমন কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ বিএনপিকে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম জিয়া সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। তিনি একটি অদ্ভুত ফর্মুলা দিয়ে বলেছিলেন, ১৯৯৬ আর ২০০১ দুই মেয়াদের তত্ত্বাধায়ক সরকার হতে দশ জনকে নির্বাচিত করতে। যা ছিল সম্পূর্ণ অবাস্তব একটি প্রস্তাব। যা কোনো মতেই বাস্তবায়ন যোগ্য ছিল না। কারণ তাদের কয়েকজন আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন আবার অনেকেই বয়সের কারণে অসুস্থ ছিলেন। বেগম জিয়ার প্রস্তাবটি ছিল শুধু নির্বাচনকে বানচাল করার নীলনকশা।

বিএনপি গো-ধরেছে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। অথচ তত্ত্বাবধায়ক কিংবা নির্দলীয় সরকার ইস্যু এখন অতীত। কারণ ২০১১ সালের ১০ মে বাংলাদেশের মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেন। পরবর্তীতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে এ ব্যবস্থাকে বাতিল করা হয়। এ রায়ের আলোকে পরবর্তী দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দশম সংসদ নির্বাচন বিএনপি জোট বর্জন করলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে এবং কারচুপির অভিযোগ তোলে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে।

বিএনপি জন্মলগ্ন থেকেই জনগণের সঙ্গে শঠতা ও কপটতার আশ্রয় নিয়েছে। জনগণকে মিথ্যা ও অসত্য তথ্য দিয়ে বারবার বিভ্রান্ত করেছে। শুধু ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে এমন কোনো কাজ নেই, যা তারা করেনি। বিএপির রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করেই বলেছিলেন, তিনি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখবেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো যে, তিনি ক্ষমতায় বসেই স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদরদের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠলেন। গ্রেফতারকৃত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়ে তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলেন। বেগম জিয়া ’৯১ সালে নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশ ভারতের অঙ্গরাজ্য হবে। ফেনী, নোয়াখালী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে।

আওয়ামী লীগ ‘৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর দেখা গেছে, তাদের অপপ্রচার মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বরং বাংলাদেশ সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী হয়েছে। অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে এনেছে শান্তির সুবাতাস। ২০০১ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি সাবাস বাংলাদেশ নামে একটি প্রামান্যচিত্র তৈরি করেছিল। সেখানে উপস্থাপক বি.চৌধুরী একহাতে কোরআন ও অন্য হাতে গীতা রেখে জনতার কাছে প্রশ্ন করেন, আপনারা কোন শাসন চান? সেমময় আওয়ামী লীগকে ভারতের দালাল ও ইসলামের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছিল। সকল অপচেষ্টাই আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

বিএনপির কাছে জাতীয় সরকারের ফর্মুলা কি? তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা যখনই ক্ষমতায় গিয়েছে তখনই যুদ্ধাপরাধী, দেশদ্রোহী, ধর্মান্ধ মৌলবাদী ও খুনীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসিয়েছে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় বসে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীকে মসিউর রহমান যাদু মিয়া, শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী ও আবদুল আলীমকে মন্ত্রী করেছে। খালেদা জিয়া একধাপ এগিয়ে আবদুর রহমান বিশ্বাসের মতো কুখ্যাত রাজাকারকে রাষ্ট্রপতি করেছে। ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটার বিহীন প্রহসনের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনী কর্নেল রশীদ ও হুদাকে সংসদ সদস্য করে পবিত্র সংসদকেই অপবিত্র করেছে। আর ২০০১ সালে বিজয়ী হয়ে তো সকল সীমানাকে অতিক্রম করেছে। নিজামী ও মুজাহিদকে মন্ত্রী করে লাল সবুজের পতাকাকে করা হয়েছে কলঙ্কিত। সাঈদী, আমিনী, গংদের আস্ফালনে বাংলাদেশ জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীতে আবার যদি কোন দিন তারা সরকার গঠনের সুযোগ পায় তাহলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানের জাতীয় সরকারে কারা থাকবে সেটা সহজেই অনুমেয়। জনগণ অতীতের মতো সে ভুলে আর পা দেবে না।

বিএনপি নির্বাচনের সময়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করছে, নতুবা তারা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। অথচ তাদের দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া একসময় তত্ত্বাবধায়ক কিংবা নির্দলীয় সরকার ইস্যুতে বলতেন, ‘বাংলাদেশে পাগল এবং শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। ফলে নিরপেক্ষ এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা সম্ভব না’। কিন্তু এখন তারাই বলছে, নিরপেক্ষ লোক দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে। বাংলাদেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুটি এখন মৃত। নির্বাচন পরবর্তী জাতীয় সরকারের মুলা দেখানো শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়। সংবিধান অনুয়ায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমন্বয়ে অন্তবর্তীকালীন সরকারের অধীনেই নিবার্চন অনুষ্ঠিত হবে।

প্রকাশকাল: ২৩ এপ্রিল ২০২২


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.