বিএনপির অনাস্থা শুধুমাত্র বিরোধিতার কারণেই বিরোধিতা

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • তাপস হালদার

ভোট হলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার। যুগ যুগ ধরে এই উপমহাদেশে মৌলিক অধিকার হরণের ভুরিভুরি উদাহরণ আছে।ভোটাধিকার রক্ষার অনেক আন্দোলনের ইতিহাস আছে। নির্বাচনে পরাজিত দল সব সময়ই ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। এটা একটা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই ভোটাধিকার পদ্ধতিকে আরো বেশি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করতে একটি যন্ত্রের আবিষ্কার হয়েছে। যার নাম হলো ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন।
এর অন্য নাম ই-ভোটিং।যা ভোটারের পরিচয় গোপন রেখে ভোট দেয়ার যন্ত্র।এই যন্ত্রে কোন কাগজ-কলমের ঝামেলা ছাড়া ভোট প্রদান করা যায়। ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় এটি একাধারে সঠিকভাবে ভোট প্রয়োগ ও দ্রুততার সাথে ভোট গণনা করতে সক্ষম।

ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ভোট দেয়া আমাদের দেশে নতুন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েক দশক আগেই শুরু হয়েছে। তবে ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কার্ড পাঞ্চের মাধ্যমে ভোট দেয়ার পদ্ধতি শুরু হয়। সেটারই আধুনিক সংস্করণ আজকের ইভিএম।

১৯৮২ সালে ভারতের কেরালা রাজ্যে সর্বপ্রথম ইভিএম ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে বিশ্বে গনতান্ত্রিক ও উন্নত দেশ গুলোর নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, বেলজিয়াম , নেদারল্যান্ড, পেরু, সুইজারল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভেনেজুয়েলাসহ অনেক দেশেই ইভিএমে ভোট নেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে ২০০৭ সালে ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের নির্বাচনে সনাতনী ব্যালট পেপারের পরিবর্তে ই-ভোটিং শুরু হয়।বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ২০১১ সালে পরীক্ষামূলক ভাবে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ইভিএমের আংশিক যাত্রা শুরু করে।২০১২ সালে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সবগুলো কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করে।তারপর থেকে জাতীয় নির্বাচনে আংশিক ও স্থানীয় সরকার(উপজেলা,পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ) গুলোতে ইভিএমে নির্বাচন হয়েছে।নির্বাচনের শুরুতে ভোটার ও প্রার্থীর কিছুটা অভিযোগ থাকলেও ভোটের পর কেউ ইভিএমকে দোষারোপ করে নি।কোন প্রার্থী বলেন নি ইভিএমের কারণে সে হেরেছে।

একজন ভোটার ব্যালট বাটন চাপলেই তার তথ্য নিবন্ধিত হয়ে যায়।নিবন্ধিত হয়ে গেলে সে একবারই ভোট দিতে পারবে।যদি ভোটার পুনরায় ভোট দিতে যায় তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইভিএম ভোট গ্রহন করবে না।একজন ভোটার কোনভাবেই একটির বেশি ভোট দিতে পারবে না।ব্যালট কাগজের সিল মারতে যে সময় লাগে তার চেয়ে ইভিএম অনেক সহজ।শুধুমাত্র প্রতীকের পাশের বাটনে চাপ দিলেই ভোট হয়ে যায়।মাত্র ১৪ সেকেন্ডে একজন ব্যক্তি ভোট দিতে পারে।মেশিনটিতে একটি পূর্ব -প্রোগ্রামিং করা মাইক্রোচিপ থাকে যা প্রতিটি ভোটের ফলাফল তাৎক্ষণিক ভাবে হিসেব করে থাকে।যন্ত্রটির উচ্চ ধারণ ক্ষমতা থাকায় ডাটাবেজ দীর্ঘ ১০-১৫ বছর সংরক্ষণ করা যায়।এতে শক্ত নিরাপত্তা চিপ থাকায় প্রোগ্রাম পরিবর্তন করা যায় না।

বিএনপি ও তাদের জোট ইভিএমের ঘোর বিরোধিতা করছে।তাদের অনেক নেতা এটিকে ভোট চুরির বাক্স বলেছে।অথচ এদেশে ভোট চুরির ইতিহাস বিএনপিরই আছে।বিএনপি যতবারই ক্ষমতায় এসেছে ততবারই জনগনের ভোটাধিকার হরণ করেই ক্ষমতায় এসেছে।জিয়াউর রহমানের আমলে হ্যা/না ভোট,খালেদা জিয়ার আমলে মাগুরা ও মিরপুরের উপনির্বাচন,১৫ ফেব্রুয়ারির কারচুপির নির্বাচন জনগন ভুলে যায় নি।বিএনপির আশংকা ইভিএম থাকলে তাদের এই সুযোগ আর থাকবে না।ভোট কেন্দ্র দখল করে সিল মারা আর করা যাবে না।

বাংলাদেশ আজ তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে মাইলফলক অতিক্রম করেছে।এমন কোন ক্ষেত্র নেই,যেখানে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগেনি।ফোর জি মোবাইল সেবা চালুর পর ফাইভ জি যুগের পথে বাংলাদেশ,মন্ত্রণালয় গুলোতে ই-ফাইল চালু,অনলাইনে জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন, রেল ও বাস টিকিটিং সিস্টেম, অনলাইনে ভিসা প্রসেসিং ও যাচাই, মোবাইল ব্যাংকিং জাতীয় ওয়েবপোর্টাল, ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত তথ্য ও সেবাকেন্দ্র চালু, এসএমএসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ফোন বিল পরিশোধ, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দুর্যোগ পূর্বাভাস সম্প্রচার সহ সকল ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে।আর নির্বাচনের ভোটে প্রযুক্তির ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত থাকাটা মূর্খতা ছাড়া আর কি?নির্বাচন কমিশন চ্যালেঞ্জ দিয়েছে,ইভিএমে কারচুপি হয় এটা প্রমান করতে পারলে পুরস্কার দিবে,কিন্তু কেউ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে প্রমান করতে আসে নি।বাংলাদেশে তো কোন ইস্যুতেই সব দল এক হওয়ার কোন ইতিহাস নেই।আওয়ামী লীগ যেহেতু ইভিএমের পক্ষে কথা বলছে,সেখানে যত যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকুক না কেন,বিএনপিকে বিরোধিতা করতেই হবে এটাই সংস্কৃতি। এজন্য বিরোধীদের বক্তব্যে কোন সারবত্তা নেই,শুধুই রাজনৈতিক।

এদেশে ভোট কারচুপির ও প্রহসনের নির্বাচনের সবচেয়ে ভিকটিম হলো আওমামী লীগ।বিএনপি ২০০৬ সালের নির্বাচনের পূর্বে এক কোটি তেইশ লাখ ভুয়া ভোটার তৈরি করা হয়।যার লক্ষ্য হলো কারচুপির মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসা।এজন্য আওয়ামী লীগের দাবি ছিল ছবি যুক্ত ভোটার তালিকা।ভোট কারচুপির কারণে আওয়ামী লীগ বারবার পরাজিত হয়েছে।আওয়ামী লীগের দাবির প্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ছবি যুক্ত ভোটার তালিকা করা হয়।আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেই ভোট কারচুপি রোধে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন অর্থ্যাৎ ইভিএম চালু করে।ভোট কারচুপি বন্ধ করতে ইভিএমের কোন বিকল্প নেই।ইভিএম পদ্ধতি পুরোপুরি চালু করতে পারলে ভোট ডাকাতি,প্রহসনের নির্বাচন বন্ধ হবে।তাহলেই একটি স্বচ্ছ নির্বাচন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।

ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগের স্লোগান ছিল ‘আমার ভোট আমি দিবো,যাকে খুশি তাকে দিবো’।বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্ব সরকার জনগনের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।ইভিএম স্বচ্ছতার সাথে জনগনের ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা দিচ্ছে।তাই ইভিএমের প্রতি জনগনের আস্তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।ইভিএমের প্রতি বিএনপির শুধুমাত্র বিরোধিতার কারণেই বিরোধিতা করা

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

প্রকাশকাল: ২৭ আগস্ট ২০২২, বাহান্ন নিউজ।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.