বাজেট কার জন্য

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

ড. আতিউর রহমান
আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট সংসদে উত্থাপিত হওয়ার পর থেকেই অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞমহল বাজেট পর্যালোচনা করছেন। অনেকেই এই বাজেটকে নিছক ‘ব্যবসাবন্ধব’ বলছেন। তাঁদের এমন বিশ্লেষণের অর্থ দাঁড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য যেন হাওয়ার মধ্যে হয়। এগুলোর সঙ্গে মানুষের কোনো সংযোগই নেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মেয়াদকালে মোট বিনিয়োগের ৮০ শতাংশ ব্যক্তি খাত থেকে আসবে। কাজেই ব্যক্তি খাতের শিল্প ও ব্যবসাগুলোর উন্নতি হলে সেই উন্নতির সুফল নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষও পাবে। যদি ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ে, যদি শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, তখন কর্মসংস্থান বাড়বে। মানুষের হাতে টাকা যাবে। এতে একদিকে এই করোনাকালে তাদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে। অন্যদিকে তাদের ভোগ বাড়ার ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে। আমাদের অর্থনীতিও আরো চাঙ্গা হবে। ফলে ‘ব্যবসাবান্ধব বনাম জনবান্ধব’-এই বিতর্ক শুধু অপ্রাসঙ্গিক নয়, বরং বিভ্রান্তিকর।
তবে এই বাজেট প্রস্তাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি এমনও নয়। এটা তো মানতেই হবে যে আমাদের খুদে উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। আগে থেকেই নাগরিকদের যে অংশটি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন করে দারিদ্র্যে পতিত হওয়া অসহায় নাগরিকরা। এমনকি মধ্যবিত্তেরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এদের বেশির ভাগই সঞ্চয় ক্ষয় করে টিকে আছে। একটি বড় অংশ বিপাকে পড়ে ফিরে গেছে শেষ আশ্রয়স্থল গ্রামের বাড়িতে। এই বিপন্ন মানুষকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেওয়া আর তাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে তুলে আনার লক্ষ্য নিয়েই বাজেট প্রণীত হয়েছে।
এই চ্যালেঞ্জিং বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সংযোগটি বিচার করতে চাই। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০তম বাজেট। ধারাবাহিকভাবে, বিশেষ করে ১০-১২ বছর ধরে সুবিবেচনাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও বহুলাংশে সেগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেছে বলে বৈশ্বিক মন্দাবস্থার মধ্যেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমাদের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.২। চলতি বছরে ৬.১ হয়েছে। আর বাজেটে প্রক্ষেপিত হয়েছে, আসন্ন বছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৭.২। তবে প্রবৃদ্ধি আসলে কতটা হবে বা না হবে—সেই বিতর্ক এই সংকটকালে মোটেও কাম্য নয়। সময় এখন মানুষ বাঁচানোর। তা সত্ত্বেও এই মহাদুর্যোগের মধ্যে আমাদের বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত চলতি অর্থবছরের ৩২.২ থেকে আসন্ন বছরে ৩৩.১ শতাংশ হয়েছে। আমাদের রপ্তানি বাড়তে শুরু করেছে। গার্মেন্টগুলোতে অর্ডার বাড়ছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে (৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে)। চলতি বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্যের সরবরাহ বাড়িয়েছে। এ জন্য তারা পলিসি রেটগুলো পরিবর্তন করার পাশাপাশি অনেক পুনরর্থায়ন কর্মসূচিও অব্যাহত রেখেছে। আসন্ন অর্থবছরে ৫.৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতির প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। আমাদের অর্থনীতি এখনো এর ‘ফুল ক্যাপাসিটি’ থেকে দূরে বলেই তারল্যের অতিরিক্ত সরবরাহ নিয়ে ভাবিত হচ্ছি না। নিম্নবিত্তের আয় কমায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা ধাক্কা খেয়েছে। আমাদের আমদানি এখনো আগের পর্যায়ে পৌঁছেনি। ফলে ‘এক্সপানশনারি মনিটারি পলিসি’র পথেই আমরা থাকতে পারব আসন্ন অর্থবছরে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে। মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি মুদ্রার বাড়তি সরবরাহ বেশ কাজে লাগছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতি আরো গতিশীল হবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে, সর্বোপরি সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। ফলে আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিষয়ে যথেষ্ট সংবেদনশীল থেকেই ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য, যে কৌশল আমরা নিয়েছি তা থেকে সুফল আসা কিন্তু বহুলাংশে নির্ভর করছে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণের ওপর। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই বাজেট প্রস্তাবে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের জন্য কর অবকাশসহ অন্যান্য কর সুবিধা রাখা হয়েছে। দেশীয় শিল্প ও উদ্যোক্তাদের বিকাশের দিকে আলাদা যে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এক ব্যক্তির মালিকানাধীন এবং একাধিক ব্যক্তির মালিকানাধীন (অ্যাসোসিয়েশন অব পারসনস) কম্পানিগুলোর আয়ের ওপর কর কমানোর ফলে ছোট-মাঝারি উদ্যোক্তারা সুবিধা পাবেন। নারী উদ্যোক্তাদের টার্নওভার করের সীমা ৭০ লাখে নেওয়া এবং গার্হস্থ্য ব্যবহারের ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকারী, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প এবং মোটরযান প্রস্তুতকারীদের যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, এগুলো সার্বিকভাবে দেশীয় শিল্পকে নতুন গতি দেবে। সরকার ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে শক্তিশালী করতে এই যে কর সুবিধাগুলো দিচ্ছে, তা অর্থনীতির খোলনলচে বদলে ফেলার উদ্যোগের একটি চমৎকার শুরু বলতে হয়।
খাতভিত্তিক বরাদ্দগুলোতেও বাজেটপ্রণেতাদের বিদ্যমান বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীলতার প্রমাণ মিলছে। আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রধানতম তিন স্তম্ভ কৃষি, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি—এই তিন খাতের জন্যই বাজেটে সময়োপযোগী প্রস্তাবনা এসেছে। কৃষির জন্য বরাদ্দ বেড়েছে ৭.৩ শতাংশ। পাশাপাশি কৃষির যান্ত্রিকীকরণে সরকারি বিনিয়োগ, আর প্রতিটি ইউনিয়নে ৩২টি করে সবজি-পুষ্টি বাগান, ৪১টি জেলায় ‘কৃষকের বাজার’, আঞ্চলিক সার্ক সিড ব্যাংক, কৃষিপণ্যের ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোও কৃষির আধুনিকায়নের জন্য খুবই কার্যকর হবে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ২ শতাংশ প্রণোদনার উদ্যোগটি চালু রেখেছেন বাজেটপ্রণেতারা। এই সুযোগ রাখা হয়েছে বলেই আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে প্রবাস আয়ের প্রবাহ নাটকীয় মাত্রায় বাড়ানো গেছে এই করোনা দুর্যোগের মধ্যেও। বিদ্যমান ট্রেজারি, প্রিমিয়াম এবং অন্যান্য বন্ডের পাশাপাশি গ্রিন বন্ড বা সুকুকে প্রবাসীদের বিনিয়োগ বাড়াতে আরো উদ্ভাবনী উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। গার্মেন্ট খাতে দেওয়া প্রণোদনা অব্যাহত রাখাটাই কাম্য ছিল, বাজেটপ্রণেতারা তাই করেছেন। তবে আমার মনে হয়, আমরা যেহেতু এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে আছি, তাই এখন গার্মেন্টের পাশাপাশি অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পে যুক্ত উদ্যোক্তাদের দিকেও একই ধরনের বিশেষ নজর দেওয়ার সময় এসে গেছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বরাদ্দ প্রস্তাবিত বাজেটে ১৮ শতাংশ বাড়িয়ে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি করা হয়েছে। মহামারিজনিত অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় প্রান্তিক মানুষকে রক্ষা করতে এ বরাদ্দ সহায়ক হবে। মহামারি আরো দীর্ঘায়িত হলে এ খাতে আরো বরাদ্দ দরকার হবে বলে মনে করি। বিশেষ করে নগর দরিদ্রদের কথা আমাদের ভাবতে হবে। সীমান্ত এলাকাগুলোতে করোনার প্রাদুর্ভাব নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। কাজেই তাদের জন্যও সামাজিক নিরাপত্তায় আলাদা বাড়তি বরাদ্দের কথা ভাবা দরকার। বাজেট প্রস্তাবে যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের মোট জনবলের ১০ শতাংশ হিসেবে বা অন্তত ১০০ জন প্রান্তিক মানুষ (তৃতীয় লিঙ্গ, বেঁদে ও অন্যান্য বঞ্চিত শ্রেণি-গোষ্ঠীর মানুষ) নিয়োগ দেবে তাদের করছাড়ের সুযোগ রাখা হয়েছে, তা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে একটি নতুন, ঐতিহাসিক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ-এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই সংখ্যা বা অনুপাত আরেকটু কমিয়ে আনার কথা ভাবা দরকার। সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি এগুলোর বাস্তবায়ন তদারকি বিশেষত উপকারভোগী নির্বাচনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে সেগুলো আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। সুখের বিষয়, সরকার এরই মধ্যে মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে। এই অনুশীলন আরো বাড়বে বলেই আশা করি। তবে এ জন্য উপকারভোগী এবং সম্ভাব্য উপকারভোগীর একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি আমাদের জন্য খুবই জরুরি।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মোট বাজেটের ৫ শতাংশের আশপাশে থাকায় এবার এই অনুপাত অন্তত ৭ শতাংশ করা হবে আশা করেছিলাম। কিন্তু বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫.৪ শতাংশ। সম্ভবত এ খাতের বরাদ্দ বাস্তবায়নে দক্ষতার ঘাটতি আর অপচয়ের বিবেচনাতেই এমন সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। তবে বরাদ্দে যেহেতু প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে, কাজেই বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগই আগামী অর্থবছরে নেই। সম্প্রতি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘মানুষের টাকা হলে স্বাস্থ্য শিক্ষা সব হবে… এ ধারণার মধ্যে চিন্তার অভাব অত্যন্ত প্রকট। কারণ এ নীতিতে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পেতে কেবল দুর্দশার মধ্যে পড়ে তা নয়, বরং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বড় সমস্যা হলে আমাদের তা মোকাবেলা করার ক্ষমতাও একেবারে কমে যায়।’ আর সে জন্য স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রের বাড়তি মনোযোগ ও বিনিয়োগ খুবই জরুরি। তাই সর্বজনের স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই আমাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো খাতগুলোতে বাজেট বরাদ্দ ও ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা খাতও কিন্তু করোনার কারণে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত। মোট বাজেটের সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ এ খাতে গেছে। তাই সাধুবাদ জানিয়ে বলতে চাই শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধিতে আটকে না থেকে করোনার কারণে আমাদের শিক্ষার্থীদের যে ‘লার্নিং লস’ হয়েছে তা পুষিয়ে নিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকা চাই। পাশাপাশি আরো বহুদিন করোনার ঘাত সহ্য করতে হবে ধরে নিয়ে এখন থেকেই শিক্ষার ডিজিটাল অবকাঠামো ঢেলে সাজানো এবং ‘ব্লেন্ডেড ক্যাম্পাস’ নিয়ে কাজ শুরু করা দরকার।
সন্দেহে করোনা মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বায়োডাইভারসিটি লস-এই তিন সংকট শুধু বাংলাদেশকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকেই ভাবাচ্ছে। কাজেই বাজেট পর্যালোচনায় জলবায়ু পরিবর্তন আর পরিবেশ সুরক্ষার জন্য যেসব উদ্যোগ রয়েছে সেগুলো আলাদাভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে। এ ক্ষেত্রে যে ইতিবাচক দিকটি আমরা লক্ষ করেছি তা হলো, এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো আলাদা করে জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন উপস্থাপিত হয়েছে বাজেট প্রস্তাবের সঙ্গে। ২৫টি মন্ত্রণালয়কে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য। এদের মোট বাজেটের ৭.২৬ শতাংশ যাবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বরাদ্দ আরো বেশি হতে পারত। বিশেষ করে আমাদের উপকূল এলাকাগুলোতে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ইত্যাদি সমস্যা মোকাবেলার দিকে আরো বেশি করে নজর দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রকল্পে বরাদ্দ আরো বেশি হওয়া জরুরি।
চাহিদামতো বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে তো সরকারের আয় বৃদ্ধিও দরকার। আসন্ন অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়নি। করোনা বাস্তবতার নিরিখে এই পদক্ষেপকে স্বাগতই জানাব। তবে রাজস্ব আহরণে আমাদের দক্ষতা ব্যাপক মাত্রায় বাড়াতে হবে। জানা গেছে, এনবিআরের ডিজিটাইজেশনের জন্য কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয় কাজ শুরু করেছে। সময়োচিত এই পদক্ষেপের জন্য সিএজি ও এনবিআর উভয় কর্তৃপক্ষ অবশ্যই ধন্যবাদ পেতে পারে। তবে এ কাজ সহজ হবে না। তাই তাদের খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। বাস্তব কারণেই ভেতর থেকেই এ কাজে বাধা আসবে। অতএব সাধু সাবধান। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বাধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের সুবিধা সরকার আগে থেকেই নিচ্ছে। এনবিআরের এতে অন্তর্ভুক্তি খুবই কাম্য। এ ছাড়া এনবিআরের জনশক্তির দক্ষতা ও জনবল বৃদ্ধি নিয়েও ভাবা চাই। ঝুলে থাকা করবিষয়ক মামলা পরিচালনার গতি বাড়াতে দক্ষ আইনজীবী প্যানেল নিয়োগ দিতে হবে। এই মামলাগুলোর কারণে ৪১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আটকে আছে। আর এনবিআরের কিছু নীতি-অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। যেমন-করোনাকালে অর্থনীতিকে সচল রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখা মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসগুলোর ওপর ২.৫ থেকে ৭.৫ শতাংশ করপোরেট করারোপ সমীচীন হয়নি। আবার তামাকপণ্যে করারোপের ক্ষেত্রে নিম্ন পর্যায়ের সিগারেট, বিড়ি, জর্দা আর গুলের কর একেবারে না বাড়ানোটিও সময়োচিত মনে হচ্ছে না।
সর্বশেষে বলতে চাই, শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক-আলোচনায় আটকে থাকা সমীচীন নয়। কারণ কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে আমাদের সংকটগুলো থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। পাশাপাশি একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিশন আমাদের দাঁড় করাতে হবে। যাতে তার আলোকে বাজেটপ্রণেতারা জাতীয় বাজেট প্রস্তাব তৈরি করতে পারেন। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, সংকট উত্তরণ শুধু সরকারের একার কাজ নয়, সরকারের একার পক্ষে তা করা সম্ভবও নয়। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতে চাই রবীন্দ্রনাথ যে ‘সচেষ্ট সমাজ’-এর কথা বলেছিলেন তার কথা। পুরো সমাজকেই আসলে এগিয়ে আসতে হবে বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে আমাদের সম্ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে। মানুষ যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে, সবাই মাস্ক পরে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে এবং যত্রতত্র চিকিৎসা বর্জ্যসহ অন্যান্য আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকে। স্বাস্থ্যগত এই বিপর্যয় কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে পুরো সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, এনজিও, নাগরিক সমাজ (বিশেষ করে তরুণরা) এবং ব্যক্তি খাতকে একযোগে দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্রিয় হতে হবে। মনে রাখতে হবে, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে এবং এসব অঞ্চলে আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ, ভেন্টিলেশন ও আইসিইউ সুবিধাসহ স্বাস্থ্যব্যবস্থা ততটা শক্তিশালীও নয়। অন্যদিকে টিকা দেওয়ার হারও বেশ মন্থর। এসব প্রতিকূলতা মনে রেখেই আমাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে করোনার দ্বিতীয় এবং পরবর্তী ঢেউ মোকাবেলার জন্য। সেই লক্ষ্য মাথায় রেখে আমাদের বাজেটটি পুনর্বিন্যাস করার মতো মানসিকতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে ব্যক্তি খাতের জন্যও তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রমাণ দেওয়ার এটিই সবচেয়ে উত্কৃষ্ট সময়।
লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং উন্নয়ন সমুন্নয়ের সভাপতি

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *