বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল

একে তো রাতে বাসায় ফিরতে দেরি হয়েছে, তার ওপর সাতসকালের ফ্লাইট। ঢুলুঢুলু চোখে কোনমতে বিমানে চেপেই দে ঘুম। আকাশে মেঘের কোলে বিমানের মৃদুমন্দ দুলুনিতে ঘুমটাও আসছিল বেশ। হঠাৎ মনে হলো কেউ যেন থাবা দিয়ে প্লেনটাকে ধরে ছুড়ে ফেলে দিল, ঠিক যেন এক ঝটকায় গাছ থেকে পেয়ারা পেরে আনার মতো। এয়ার পকেটে পড়ে প্লেনের বাম্পিংয়ের তোড়ে ঘুম এক নিমেষেই কোথায় হাওয়া হয়ে গেল। মনে মনে স্রষ্টাকে জপতে জপতে প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই সম্পূর্ণ অপরিচিত দৃশ্যপট। চারদিকে পানি আর পানি। থৈ থৈ জলরাশির বিশাল বিস্তারে সাধের সিলেটের স্থলভাগের চিহ্নটি যেন উধাও হয়ে গেছে।

বেশ কিছুদিন ধরেই নিয়মিত সিলেটে আসি, যাই। বয়স বাড়তে থাকলে শেকড়ের টানটা অনুভূত হয় আরও জোরে। নিজের বয়স বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে এটা জীবন থেকে নেয়া উপলব্ধি। পিতৃ পুরুষের আদি নিবাস সিলেটে। সিলেট বলতে সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্র কালীঘাটে। জায়গাটা সিলেটের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। অনেকটা ঢাকার চকবাজার আর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মতো। সেই সুবাদে আমি খাঁটি ‘সিলেটী কুট্টি’। নিয়মিত সিলেটে যাই, লিভারের রোগীদের দেখি আর প্রতিবারই আরও বেশি প্রশান্তি নিয়ে ঢাকায় ফিরি। যাওয়া আর আসাÑদুটোই নিয়মিতই বিমানে। মেট্রোপলিটন শহরে পৈত্রিক নিবাসে বিমানে চড়ে যাওয়া, আসার সৌভাগ্য এদেশে কম মানুষেরই হয়। সেই বিরল সৌভাগ্যবানদের অন্যতম আমি। আদি ভিটা মেট্রোপলিটন শহরে আর সেই শহরে আছে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কাজেই মাটির টানে নিজ ভিটায় যাওয়া-আসায় এই বিরল সুযোগটি সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে কখনই ভুল করি না। আর সে কারণেই সিলেটের এরিয়াল ভিউ সম্বন্ধে আমার ধারণা খুব স্বচ্ছ। কিন্তু এই দফায় বিমানের জানালা দিয়ে যে সিলেটকে দেখেছি, তা আমার একেবারেই অচেনা। এমনটা দেখা যায় কক্সবাজার এয়ারপোর্টের রানওয়েতে বিমান যখন ল্যান্ডিংয়ের জন্য এপ্রোচ করে, শুধু তখনই।

এবারের সিলেট যাত্রায় রথ দেখার পাশাপাশি কলা বেচারও একটা পর্ব ছিল। ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরেই লিভার সিরোসিস ও লিভার ফেইলিওরের রোগীদের চিকিৎসায় স্টেম সেল থেরাপি করে আসছি। এই দফায় সিলেটেও এটি শুরু করার কথা। আর এটি হবে ঢাকার বাইরে বাংলাদেশের কোথাও প্রথমবারের মতো স্টেম সেল থেরাপির মাধ্যমে লিভার সিরোসিসের রোগীকে চিকিৎসার ঘটনা। সঙ্গত কারণেই রক্তে এড্রোনালিনের মাত্রা কিছুটা বেশি ছিল। দুপুর নাগাদ সিলেটের একটি বেসরকারী হাসপাতালে সফলভাবে স্টেম সেল থেরাপি সম্পন্ন করে ছুটলাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটি অভিজাত হোটেলে। সেখানে সংবাদমাধ্যমের স্থানীয় সহকর্মীদের জন্য এ বিষয়ে একটি প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়েছে। যদিও সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে আগেই জেনেছি, তবে এবার তাদের কাছে জানলাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা।

আঠারো বছরে যা দেখেনি, তাই এবার দেখছে সিলেটের মেট্রোপলিটন শহরবাসী। পানি উঠেছে সিলেট শহরের অভিজাত আর বনেদি এলাকাগুলোতেও। পৈত্রিক ভিটার কেয়ারটেকার সাধের ভিটাটুকু স্রষ্টার হাওলায় দিয়ে নিরাপদ জায়গায় সরে পড়েছে। কারণ, ভিটাতেও হাঁটুপানি। কথা হলো আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও। ছুটছেন তারা প্রাণপণে। দাঁড়াচ্ছেন পানিবন্দী মানুষগুলোর পাশে। রান্না করে দুই বেলা খাওয়ার মতো শুকনো জায়গাটুকুও অনেক জায়গায় নেই। রান্না করা খাবার নিয়ে সেসব জায়গায় ছুটছেন মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। নেতৃত্বে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক ভাই আর সাধারণ সম্পাদক মানুষ গড়ার কারিগর অধ্যাপক জাকির ভাই। এগিয়ে এসেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ও। সঙ্গে এগিয়ে এসেছে স্থানীয় প্রশাসনও। সব মিলিয়ে সবার সদিচ্ছায় পানিবন্দী অসহায় সিলেটবাসীর বন্দিত্বের যাতনা কিছুটা হলেও লাঘব হচ্ছে দেখে ভাল লাগল। পরদিন সাতসকালে কিছু চাল আর ডাল স্থানীয় রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির কার্যালয়ে সিলেট নগর আওয়ামী লীগের দুই কর্ণধার- মাসুক ভাই আর জাকির ভাইয়ের হাতে সঁপে দিয়ে সেই ভাল লাগার অনুভূতিটাকে আরেকটু নিজের করে নেয়ার প্রয়াস পেলাম।

এই দফায়ও গিয়েছিলাম সিলেটের লিভারের রোগীদের লিভারগুলোকে একটুখানি মেরামত করে আসার নিয়তে। সঙ্গে ঢাকার বাইরে সিলেটে প্রথমবারের মতো স্টেম সেল থেরাপি করে পূর্বপুরুষের ঋণ পরিশোধের আগ্রহটাও ছিল ষোলো আনা। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে এবারের সিলেটটা পুরোপুরি আঁকা হলো পানিমগ্ন একটি ক্যানভাসে। রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে আর স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলতে আর জানতে গিয়ে জানার চেষ্টা করেছি, কেন এমনটা হলো। বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলবায়ুর পরিবর্তন আর হয়তবা এসব কারণে মাত্রাতিরিক্ত ভারি বর্ষণ। সঙ্গে আছে উজান থেকে টিলার ঢাল বেয়ে নেমে আসা পানির তীব্র স্রোতধারাও। ভাবতে অবাক লাগছিল, এমনটা কেন হবে? উজানের পানিতে যখন সিলেটের মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়, তখন তো তাতে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় অসমের মানুষেরও; ঠিক যেমন তিস্তার প্লাবনে এপারের বাঙালী ডুবলে হৃদয়ে মাতম ওঠে ওপারের বাঙালীর। কারণ, আজ ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা হয়ত ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিক। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতায় আমরা তো আসলে একই মানুষ। একাত্তরে আমরাই তো এই বাস্তবতার মানবিক স্বাক্ষর রেখেছি। এপারের শরণার্থীকে নিজ আঙ্গিনায় আপন করে নিয়েছিলেন ওপারের মানুষগুলো। দুই পারের মানুষগুলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সেদিন লড়েছে দখলদার পাকিস্তানী হার্মাদদের বিরুদ্ধে। বাংলার পলিমাটিতে পাকিস্তানী হায়েনাদের যে নাকানি-চুবানি, তা তো সীমানার এপার আর ওপারের মানুষগুলোর যৌথ উদ্যোগেরই ফল। এরই ধারাবাহিকতায়ই তো ওপার আর এপারের ‘আমাদের’ রক্তের মিলিত স্রোতধারায় অর্জিত হয়েছিল সবুজের পটভূমিতে আমাদের রক্ত লাল পতাকাটি।

সিলেটে থাকতেই খবর পেলাম, এবার বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ঘরের পাশে, সিলেট থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে অসমের রাজধানী গৌহাটিতে। দুই দেশের রাজধানীর বাইরে এবারই প্রথমবারের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ এই মিটিংটি বসছে ভারতের কোন প্রাদেশিক রাজধানীতে। আর সেটাও এমন একটা সময় যখন পানি ‘সম্পদের’ বদলে হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিবেশী সিলেটবাসীর জীবনমরণ সমস্যা। বলা হয়, আগামীর বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হবে পানিকে কেন্দ্র করে। অন্যদিকে পানি সম্পদের সুষ্ঠু আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনার মধ্যেই নিহিত আছে ভবিষ্যতে উন্নয়নের চাবিকাঠি। যে ভারত আর বাংলাদেশ একাত্তরে পারস্পরিক সযোগিতার এমন অদ্বিতীয় উদাহরণ স্থাপন করেছে, তারা সামনে সেই স্পিরিটকে ধারণ করে আরও সামনে এগিয়ে যাবে- এমনটাই প্রত্যাশিত। তার আলামতগুলোও চারপাশে সুস্পষ্ট। কাজেই যৌথ পানি কমিশন এবার যখন বসতে যাচ্ছে ঘরের পাশে গৌহাটিতে এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা, এই বৈঠকটিতে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন একজন ‘সিলেটী কুট্টি’, সিলেট শহর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, তখন আমাদের প্রত্যাশার পারদ যে সিলেটের নিচু টিলাগুলোকে ছাপিয়ে অনেক উঁচুতে, সে তো বলাই বাহুল্য।

যৌথ নদী কমিশনের আসন্ন বৈঠকটি নিয়ে কদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে চমৎকার একটি কলাম লিখেছেন ভারতের নামজাদা সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল। তার লেখাটির শুরুতে তিনি অধ্যাপক প্রমথনাথ বিশীর একটি লেখা কোট করেছেন চলনবিল, কলকাতা ১৯৫৭, পৃষ্ঠা ১৭-১৮ থেকে। লেখার উপসংহারটুকু ধার করছি তার ভূমিকা থেকেই। অধ্যাপক বিশী লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের নদীকে যে নিবিড়ভাবে জানতে পারে না সে কিভাবে বাংলাদেশকে জানবে? বঙ্গোপসাগরের নরম বেলাভূমিতে মিলিত হয়েছে সমুদ্র ও নদী। নদী-নারী, সমুদ্র-পুরুষ, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উত্তাল ঢেউয়ের দোলায় তাদের মিলন ঘটে। কোমল, পাললিক বঙ্গ তাদের শিশু’। নিশ্চিত জানি বাংলাদেশ আর ভারতের জনঘনিষ্ঠ বর্তমান নেতৃত্ব বাঙালীর এই বিশেষ দিকটি ভালভাবেই জানেন। আর সেটাই অকালবন্যা প্লাবিত সিলেটের মানুষগুলোর একজন হিসেবে আমাদের শক্তি জোগায় আর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকটি নিয়ে অনেক বেশি আশাবাদী করে তোলে।

 

লেখক: সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
প্রকাশকাল: ২৮ মে ২০২২, দৈনিক জনকণ্ঠ


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *