পারস্পরিক আস্থা ও অবিচল বন্ধুত্বের বার্তা

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • তাপস হালদার

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল জয়পুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে রাজস্থানের একটি সাংস্কৃতিক দল নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানায়। এ সময় তিনি হাত নেড়ে তাদের উৎসাহ দেন।

বৈশ্বিক করোনা মহামারির পর চার দিনের ভারত সফর করলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের অংশ হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণের পরিপ্রেক্ষিতে এই সফর। বাংলাদেশ কিংবা ভারত উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় সফরে টানটান উত্তেজনা থাকে। রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছেও আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়।

স্বাভাবিকভাবে দেখলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফরে দুই দেশের গভীর বন্ধুত্ব ও আস্থার সম্পর্ক আরো জোরদার হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানিয়েছেন ভারতের রেল ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী দর্শনা বিক্রম জারদোশ। এ ঘটনার পর বিরোধী দলগুলো হৈচৈ শুরু করে দেয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত কোনো গুরুত্ব দেয় না বলেই প্রতিমন্ত্রীকে পাঠিয়েছে বিমানবন্দরে, এমন ধারণা নিয়ে যাঁরা সমালোচনায় মুখর ছিলেন, পরক্ষণেই তাঁদের মোহভঙ্গ হয়েছে। ভারতে রাষ্ট্রীয় অতিথিদের বিমানবন্দরে স্বাগত জানান মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এমনকি সচিবরা। মূল অনুষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা জানানো হয় রাষ্ট্রপতি ভবনের সামনে, যেটি আমাদের দেশে বিমানবন্দরে হয়। নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিংপিন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদাসহ অনেক রাষ্ট্রপ্রধানকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানিয়েছেন কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সচিব।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মাত্র তিনবার প্রটোকল ভেঙে বিমানবন্দরে গিয়ে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। এক. প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, দুই. আবুধাবির আমির, তিন. ২০১৭ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের সময়। সেদিনও প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় বিমানবন্দরে স্বাগত জানানোর দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সব প্রটোকল ভেঙে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে আচমকাই বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেটা খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল। বিরল দৃষ্টান্ত।

সাধারণত দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একসঙ্গে লাঞ্চ করেন, এটাই প্রচলিত প্রথা। কিন্তু এবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি প্রথা ভেঙেছেন। মোদি শেখ হাসিনার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দুপুরের খাবারের আয়োজন করেছেন। তাঁদের পদমর্যাদার আর কেউ সেখানে ছিলেন না। তাই ওই দু্ইজনের বাইরে সেখানে কারো থাকার সুযোগ ছিল না। এটাকে কেউ কেউ বিরল হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন।

সফরের দ্বিতীয় দিনে হায়দরাবাদ হাউসে অনুষ্ঠিত দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সাতটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো কুশিয়ারা নদী থেকে বাংলাদেশ কর্তৃক ১৫৩ কিউসেক পানি প্রত্যাহার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক। এ ছাড়া দুই প্রধানমন্ত্রী ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে রামপালে মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট, রূপসা রেল সেতু, ভারতীয় ঋণে খুলনা ও দর্শনা রেললাইন প্রকল্প, পার্বতীপুর রেললাইন প্রকল্প এবং সড়ক নির্মাণ সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন।

ঢাকা-দিল্লির পক্ষ থেকে ৩৩ দফা যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দফাটি হলো বাংলাদেশকে ভারতের ট্রানজিট প্রদান। এখন থেকে তৃতীয় যেকোনো দেশে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে পারবে বাংলাদেশ। অর্থাত্ বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য ভারতের স্থল, নৌ ও বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশে রপ্তানি করতে পারবে বাংলাদেশ। এর জন্য ভারতকে কোনো শুল্ক বা ফি দিতে হবে না। যদিও আগে থেকেই নেপাল ও ভুটানে রপ্তানির জন্য বিনা মূল্যে বাংলাদেশকে ট্রানজিট দিয়ে আসছে ভারত। এ ছাড়া যৌথ বিবৃতিতে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা, বাংলাদেশকে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ এবং চলতি বছরই সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (সেপা) সইয়ের বিষয়ে দুই নেতা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।

আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার সরকারই সব সময় ভারত থেকে ন্যায্য হিস্যা আদায় করেছে। অন্যরা কখনোই তা পারেনি। ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে ৩০ বছরমেয়াদি ভারতের সঙ্গে ফারাক্কার গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি। অথচ ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ভারত সফরে গিয়ে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার কথা সাহস করে বলতে পারেননি। দেশে ফেরার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজেই মুখ ফসকে বলেন, ‘আমি তো গঙ্গার পানির কথা বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম। ’ এ ছাড়া জিয়াউর রহমানের সময়কালে তিস্তা নদীর গজালডোবায় যখন ভারত ব্যারাজ নির্মাণ করে, তখনো জাতীয় বা আন্তর্জাতিকভাবে কোনো প্রতিবাদ জানাতে পারেনি বিএনপি। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শাসনামলে ভারত সফরকালে গঙ্গা কিংবা তিস্তার প্রসঙ্গ কেউ কখনো তোলেনি।

নিন্দুকেরা বাংলদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্তরায় হিসেবে বারবার তিস্তার কথা তুলে ধরে। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তিস্তার পানি সরবরাহে ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে। মোদি সরকারও বাংলাদেশের সঙ্গে সহমত পোষণ করে চুক্তি করতে সম্মত। এ ক্ষেত্রে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। ভারতে যেহেতু ফেডারেল রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে সরকার চলে, সেখানে কেন্দ্র-রাজ্য সমঝোতা না হলে চুক্তি বাস্তবায়ন অসম্ভব। মোদি সরকারের আন্তরিকতা থাকলেও তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য তিস্তা চুক্তি এখনো ঝুলে আছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সমঝোতা হলেই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান পাবে বাংলাদেশ।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বা গুরুতর আহত ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সৈনিক বা কর্মকর্তাদের সরাসরি বংশধরদের জন্য শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে ‘২০০টি মুজিব বৃত্তি’—যার মধ্যে দশম শ্রেণিতে ১০০টি এবং দ্বাদশ শ্রেণির স্তরে ১০০টি বৃত্তি প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যা সফরে বন্ধুত্বের একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সব সময় কূটনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে না। দুই দেশের সম্পর্ক রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ। দুই দেশের শুধু সরকারই নয়, জনগণের সঙ্গে জনগণের বন্ধুত্ব। সে জন্যই করোনা মহামারির সময়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও মুজিব শতবর্ষের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আর বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। এসব অনুষ্ঠান উপলক্ষে দুই দেশ বেশ কিছু যৌথ কর্মসূচির আয়োজন করে। যার মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু ও মহাত্মা গান্ধী এবং বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ, বঙ্গবন্ধু-বাপু ডিজিটাল প্রদর্শনী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী নিয়ে যৌথ প্রযোজনার নির্মাণাধীন বায়োপিক ‘মুজিব : দ্য মেকিং অব দ্য নেশন’, যা শিগগিরই মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। দিবসটিকে ‘মৈত্রী দিবস’ হিসেবে বাংলাদেশ-ভারত যৌথভাবে পালন করেছে। এ ছাড়া ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের অংশগ্রহণ ছিল বন্ধুত্বের এক অপূর্ব নিদর্শন।
২০১৫ সাল থেকে ১২ দফা বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এসব বৈঠক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য মাত্রা যোগ করেছে। দীর্ঘদিনের অনেক অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধান হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন, ‘ভারত আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। আমাদের পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বন্ধুত্বের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা যায় আমরা সব সময় তা করি। ’

ভারতের কাছ থেকে ন্যায্য হিস্যা আওয়ামী লীগই আদায় করতে পারে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেটি বারবার করে দেখিয়েছেন।

লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

প্রকাশকাল: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, কালের কণ্ঠ।

 


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.