জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • এ কে এম আতিকুর রহমান

 

আমরা জানি জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয় যখন বিশ্বে দুটি প্রধান শক্তি ব্লক তৈরি হয়—একটি সোভিয়েতপন্থী সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর ব্লক এবং অন্যটি আমেরিকাপন্থী পুঁজিবাদী দেশগুলোর ব্লক। আন্দোলনটি সেই শীতল যুদ্ধের সময় পশ্চিম ও পূর্ব ব্লকের মধ্যে উন্নয়নশীল বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি মধ্যম পথের রচনা করে। বলতে গেলে ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’ সৃষ্টিকে ত্বরান্বিত করার পেছনে কাজ করেছিল ১৯৪৯ সালে গঠিত ন্যাটো এবং ১৯৫৫ সালে গঠিত ওয়ারশ প্যাক্ট। স্বাধীনতা ও শান্তিকামী মানুষ ওই দুই বলয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে চায়নি।

ওই আন্দোলনের পুরোধা হয়ে এগিয়ে এসেছিলেন যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোসিপ ব্রজ টিটো, ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু, মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ন এবং ঘানার প্রেসিডেন্ট নক্রুমা।
বিশ্বের বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার নেতাদের নিয়ে ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং-এ অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সম্মত নীতির ওপর ভিত্তি করেই জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬১ সালের সেপ্টেম্বরে যুগোস্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে। ওই সম্মেলনে বিশ্বের ২৫টি দেশের নেতারা অংশগ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানে এই জোটের সদস্য সংখ্যা ১২০, অর্থাৎ বিশ্বের ৫৫ শতাংশ জনগণ। বলতে গেলে জাতিসংঘের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই এই জোটের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে জোটনিরপেক্ষ গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিল।

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মৌলিক নীতিগুলো হচ্ছে—মৌলিক মানবাধিকার এবং জাতিসংঘ সনদের উদ্দেশ্য ও নীতির প্রতি শ্রদ্ধা, সব জাতির সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা, জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বীকৃতি, বৃহৎ ও ক্ষুদ্র সব জাতির সমতার স্বীকৃতি, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকা, জাতিসংঘের সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এককভাবে বা সম্মিলিতভাবে আত্মরক্ষা করার প্রতিটি জাতির অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, কোনো দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আগ্রাসনের কাজ বা হুমকি বা শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকা, জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সব আন্তর্জাতিক বিরোধের নিষ্পত্তি, পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতার প্রচার এবং ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার প্রতি শ্রদ্ধা।

আমরা যদি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক বিষয়গুলোর দিকে তাকাই, তাহলে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বঙ্গবন্ধু জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নীতি ও আদর্শকে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে কতটা ধারণ করেছিলেন। বলতে গেলে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির পরতে পরতে আমরা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মৌলিক নীতিরই প্রতিফলন দেখতে পাই। এ ছাড়া জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে অগাধ বিশ্বাস ও দৃঢ় আস্থা ছিল তার সুস্পষ্ট প্রমাণও আমরা পাই আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটের শীর্ষ সম্মেলনে প্রদত্ত তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে।

দিনটি ছিল ১৯৭৩ সালের ৩ জুলাই। আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়েরি বুমেদিনের বিশেষ দূত মোহাম্মদ ইয়াজিদ ঢাকা এলেন বঙ্গবন্ধুর জন্য প্রেরিত প্রেসিডেন্ট বুমেদিনের একটি বার্তা নিয়ে। বার্তাটি আর কিছুই ছিল না, ওই বছরের সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিতব্য জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে তাঁর অংশগ্রহণের জন্য নিমন্ত্রণপত্র। বঙ্গবন্ধু ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণের কথা বিশেষ দূতকে জানিয়ে দিতে সময় নেননি। কারণ তখকার আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য জোটনিরপেক্ষ গোষ্ঠীর সম্মেলনে অংশগ্রহণ করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, জরুরি এবং প্রাসঙ্গিক।

বঙ্গবন্ধু মাত্র একটি জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করতে পেরেছিলেন এবং তা ছিল আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনটি। ওই সম্মেলনের উদ্বোধনী এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন। এ ছাড়া শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য দেশের নেতাদের, যেমন হুয়েরি বুমেদিন, হাইলে সেলাসি, শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, ফিদেল কাস্ত্রো, প্রিন্স নরোদম সিহানুক, কর্নেল গাদ্দাফি, মার্শাল টিটো, আনোয়ার সাদাত, ইদি আমিনের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেন। উল্লেখ্য, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ওই সব দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বঙ্গবন্ধু কয়েকটি বিষয়ের, বিশেষ করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন, বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান, বাংলাদেশের পুনর্গঠন কাজসহ অন্যান্য সমস্যাসংকুল ক্ষেত্রে সহযোগিতা, জাতিসংঘের সদস্য পদে সমর্থন ইত্যাদির ওপর জোর দেন।

যেহেতু বঙ্গবন্ধু একমাত্র আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনেই অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাই এখানে ওই সম্মেলনে তিনি যেসব বক্তব্য দিয়েছিলেন সেসবের উল্লেখ করার মাধ্যমে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততার গভীরতা অনুধাবনের চেষ্টা করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেন যে বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে পদার্পণের মুহূর্তে জোটনিরপেক্ষ নীতির সমর্থনে যে উল্লেখযোগ্য আন্দোলন দেখা দিয়েছে, তা অর্থহীন নয়। এই শতাব্দী ইতিহাসের নৃশংসতম ও সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের শিকার হয়েছে। এই শতাব্দী মেহনতি মানুষের জাগরণও প্রত্যক্ষ করেছে। সবাই বুঝতে পারে, জোটনিরপেক্ষ নীতিতে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে মৌলিক আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।

সম্মেলনের শেষ দিন বঙ্গবন্ধু তাঁর সমাপনী ভাষণে জোটের দায়িত্ব প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটি বিশ্বের শান্তি ও অগ্রগতির শক্তির কণ্ঠস্বর, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানবজাতির কণ্ঠস্বর। যদি মানবজাতিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের অমানবিকতা থেকে বাঁচানোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব পূরণ করতে হয়, তবে অবশ্যই বিশ্বসংগঠনকে মনোযোগ দিতে হবে। জাতিসংঘ ব্যর্থ হতে পারে না, কারণ মানবজাতির বেঁচে থাকা ঝুঁকিতে রয়েছে। ’ মানবজাতির কল্যাণের কথা এমন করে সেদিন যে কতিপয় বিশ্বনেতা ভাবতে পেরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অন্যতম।

বক্তব্যের শেষ প্রান্তে এসে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভ্রাতৃত্বের সংহতি প্রকাশের জন্য সম্মেলনে উপস্থিত সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি স্বাধীনতাসংগ্রাম ও বিদ্যমান পরিস্থিতির বর্ণনা দেন এবং বাংলাদেশের সমস্যাগুলো বোঝার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। বাংলাদেশের প্রতি সবার সমর্থন দেখে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন জোটনিরপেক্ষ গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ দিয়েছি এবং আল্লাহর কৃপায় ও জোটনিরপেক্ষ গোষ্ঠীর সমর্থনে আমরা জাতিসংঘের সদস্য হব। ’ বলার অপেক্ষা রাখে না, ওই জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এক আশার আলো প্রজ্বলিত করেছিল। যার ফলাফল পরের বছরের শুরুতেই আমরা অবলোকন করি। ১৯৭৪ সালে আমরা জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করি।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব
প্রকাশকাল: ১৫ আগস্ট ২০২২, কালের কণ্ঠ


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.