ছয় দফা : ‘দফা তো একটাই, একটু ঘুরাইয়া কইলাম’

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • তাপস হালদার 

ছয় দফা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুকে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি এই যে ৬ দফা দিলেন, তার মূল কথাটি কী? উত্তরে বঙ্গবন্ধু আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘আরে মিয়া বুঝলা না, দফা তো একটাই। একটু ঘুরাইয়া কইলাম।’ বঙ্গবন্ধুর ঘুরিয়ে বলা কথাটি হলো পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত শাসন অর্থাৎ স্বাধীনতা।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে এই অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে স্বাধিকার আন্দোলনের দাবী উঠেছে কিন্তু সব দাবিকে একত্রিত করেই ছয় দফা একক এজেন্ডায় পরিণত হয়।

ছয় দফার দাবি হুট করে আসেনি। দীর্ঘদিনের অন্যায়, অবিচার, শোষণ, বঞ্চনা থেকে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল তারই বহিঃপ্রকাশ। যার মূল কারণ ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক বৈষম্য। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ‘৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি- এই সব বিষয়গুলো থেকে আস্তে আস্তে ছয় দফার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।

কিন্তু ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠে। ১৭ দিনের যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। এখানে যেমন ছিল না কোনো সৈন্য, না ছিল অন্য কোনো সীমান্ত প্রহরী। ভারত চাইলেই পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিতে পারতো। পাকিস্তান সরকারের এই ধরনের খামখেয়ালীপনা আচরণের জন্য এ অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।যার কারণে দ্রুতই ছয় দফার চূড়ান্ত প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই মোক্ষম সময়টি বেছে নেন। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি লাহোরে বিরোধী দলের একটা সম্মেলনে ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। কিন্তু তা গৃহীত না হলে পরের দিন ৬ ফেব্রুয়ারি সম্মেলন বর্জন করেন। এই ছয় দফার কারণে পাকিস্তানের গনমাধ্যমগুলো শেখ মুজিবকে বিছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করে। পাকিস্তানের অন্যান্য দলগুলো তো দূরের কথা, নিজ দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ অনেক নেতারই সমর্থন ছিল না। শুধুমাত্র ছাত্রলীগের তরুণ নেতারা সমর্থন করেছিল।

বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয় দফা কর্মসূচি ছিল মুলতঃ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কিত। প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কিত বিষয়গুলো হলো:-

(১) পাকিস্তানের এককেন্দ্রীক শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করে ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা চালু করা। (২) কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারে কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রীয় বিষয় থাকবে। অবশিষ্ট সব বিষয়ে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রদেশগুলির হাতে।

অর্থনীতি সম্পর্কিত বিষয় গুলো হলো:- (৩) প্রতিটি স্বতন্ত্র প্রদেশের জন্য পৃথক ও অবাধে রূপান্তরযোগ্য মুদ্রা চালু। কিংবা, যদি একক মুদ্রা ব্যবহার করা হয়, সেক্ষেত্রে এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে মুদ্রা পাচার রোধ করার উপায় থাকতে হবে। (৪) রাজস্ব আদায় ও বণ্টনের মূল দায়িত্ব থাকবে প্রদেশের হাতে। (৫) প্রতিটি প্রদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে থাকবে। (৬) প্রতিটি প্রদেশে নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী থাকবে।

বঙ্গবন্ধু যখন লাহোরে ছয় দফা পেশ করেন তখন তিনি ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক।একমাস পরেই দলীয় কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হয়েই ছয় দফার দাবী নিয়ে তিনি সারা বাংলা ঘুরে বেড়ান। জনগণকে ছয় দফার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করতে থাকেন।পাকিস্তান সরকার অবস্থা বেগতিক দেখে ৮ মে, ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে। এবং একটানা ৩৩ মাস কারাবন্দি করে রাখে।

ছয় দফার সমর্থন ও বঙ্গবন্ধুসহ রাজবন্দীদের মুক্তির দাবীতে ১৯৬৬ সালের ১৩ মে, আওয়ামী লীগ আয়োজিত পল্টনের জনসভা থেকে ৭ জুন হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সেদিন পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল হরতাল হয়। হরতালের সমর্থনে সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ রাজপথে নেমে আসে।অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ৭ জুনের হরতালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রতিবাদ করলে ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, মজুরদের উপর পাকিস্তানী সামরিক জান্তা নির্বিচারে গুলি চালায়।ঢাকা, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জে ১১ জন বাঙালি শহীদ এবং অসংখ্য নেতাকর্মী আহত হন। প্রায় আটশ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও সাধারণ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।

৭ জুন শহীদদের রক্তে রচিত হয় স্বাধীনতার ভিত্তি। ছয় দফাকে কেন্দ্র করে জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত জাগরণ সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ৬ দফাকে ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে আন্দোলনে নামেন বাংলার ছাত্রসমাজ। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুব খান গদি ছাড়তে বাধ্য হন।১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দি মুক্তি লাভ করেন।

ছয় দফা আস্তে আস্তে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদে রূপান্তরিত হয়ে এক দফার দাবিতে পরিণত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ‘৭০ সালের আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ ও একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ৭ জুন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়। ছয় দফা বাঙালির মুক্তির সনদ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলভিত্তি।

প্রকাশকাল: ০৭ জুন ২০২২, সুখবর ডট কম।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *