গণতন্ত্রের মুক্তির দিন

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • এম নজরুল ইসলাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মানুষের দায় মহামানবের দায়, কোথাও সীমা নেই। অন্তহীন সাধনার ক্ষেত্রে তার বাস। … দেশ শুধু ভৌমিক নয়, দেশ মানসিক। মানুষে মানুষে মিলিয়ে এই দেশ জ্ঞানে জ্ঞানে, কর্মে কর্মে। … আমরাও দেশের ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে উৎসর্গ করেছি। সেই ভবিষ্যেক ব্যক্তিগতরূপে আমরা ভোগ করব না। … ভবিষ্যতে যাঁদের আনন্দ, যাঁদের আশা, যাঁদের গৌরব, মানুষের সভ্যতা তাঁদেরই রচনা। তাঁদেরই স্মরণ করে মানুষ জেনেছে অমৃতের সন্তান, বুঝেছে যে তার সৃষ্টি, তার চরিত্র, মৃত্যুকে পেরিয়ে। ’ কথাগুলো শেখ হাসিনার জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি দেশের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করেছেন নিজের বর্তমান। ব্যক্তিগতভাবে বর্তমানকে ভোগ করেন না তিনি। আর সে কারণেই বাঙালির সঙ্গে তাঁর জন্মান্তরের নিবিড় যোগসূত্র। দেশের মানুষের আস্থা ও অস্তিত্বে তাঁর স্থায়ী আসন। মানুষের পাশে থাকেন সব সময়।
অমৃতের সন্তান শেখ হাসিনা চেপে বসা তত্ত্বাবধায়কদের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন ২০০৮ সালের ১১ জুন। তাঁর মুক্তিতে সেদিন যেন মুক্তি পেয়েছিল রুদ্ধ গণতন্ত্র। তাঁকে মুক্তি দিয়েই নির্বাচনের দিকে এগোতে হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। ১১ জুন তাই গণতন্ত্রের মুক্তির দিন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটেছিল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি। আবির্ভাব ঘটেছিল কথিত ওয়ান-ইলেভেনের। সেই ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই মিথ্যা মামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে।

২০০৭ সালে একটি চেপে বসা অপশক্তি সেই সময়ের বাস্তবতায় প্রবল প্রতাপে দেশ শাসন করে গেছে। গণতন্ত্র তখন রুদ্ধ। সেই চেপে বসা শাসকদের বিবেচনায় রাজনীতি তখন যেন ছিল গর্হিত অপরাধ। আর সে কারণেই রাজনীতিক পরিচয় দিতেও যেন অনেকে কুণ্ঠিত ছিলেন তখন। পাঁচ বছরের জোট অপশাসনের সুযোগ নিয়ে চেপে বসা শাসককুল তখন রীতমতো ত্রাস। রাতারাতি সব কিছু বদলে ফেলার আভাস দিয়ে রাজনীতি থেকে জঞ্জাল পরিষ্কার করার কথা তখন এমন করে বলা হয়, যেন রাজনীতি এক গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত ছিল। সাহসী রাজনীতির পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ইতিহাস মুছে ফেলার কুৎসিত, নির্মম ও ভয়াবহ চক্রান্ত করেছিল প্রতিক্রিয়াশীল চক্র! নিষ্ঠুর রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও চক্রান্তের জাল বিছিয়ে সংকীর্ণ রাজনীতির হীনম্মন্যতার ছদ্মাবরণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি নস্যাৎ করার জঘন্য চেষ্টা করেছিল তারা।

আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনের সঙ্গে তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আমরা যদি জাতির পিতার রাজনৈতিক জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তাহলে দেখতে পাই জীবনের বেশির ভাগ সময় তাঁকে থাকতে হয়েছে কারা অভ্যন্তরে। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এই মহান নেতাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি পশ্চিম পাকিস্তানের চেপে বসা শাসকগোষ্ঠী। বঙ্গবন্ধুর মতোই যেন ভাগ্যবরণ করতে হয়েছে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাকে। দেশের মানুষ যখন অধিকারবঞ্চিত, ১৯৮১ সালে তিনি চেপে বসা শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফিরে দাঁড়িয়েছেন অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে। যেমন দাঁড়িয়েছিলেন জাতির পিতা। শেখ হাসিনার চলার পথটা সহজ ছিল না কোনো দিনই।

আবার এটাও তো ঠিক, এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে জেলজুলুম নতুন কোনো ঘটনা নয়। মহৎ রাজনীতিকরা কারাগারে বসেই তাঁদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করেছেন—এমন অনেক নজির আছে। জননেত্রী শেখ হাসিনাও নির্জন কারাবাসকালে অলস সময় কাটাননি। কারাগারের নির্জনতাকে তিনি তাঁর সৃজনশীল রাজনৈতিক চিন্তায় পার করেছেন। তাঁর চরিত্রের যে বিষয়টি সবারই নজর কাড়ে, তা হচ্ছে তাঁর গভীর প্রত্যয়। দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ জননেত্রী গভীর সংকটেও জনগণের কল্যাণচিন্তা করেন। সেই চিন্তার প্রতিফলন এরই মধ্যে ঘটেছে। এক স্মৃতিচারণায় জননেত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা, তা সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাগারে নিঃসঙ্গ দিনগুলোতেই তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁর এই নিরলস চিন্তার ফসল ঘরে তুলেছে বাংলাদেশ। গত ফেব্রুয়ারিতে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সাল থেকে স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকা বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে সিডিপির সব শর্ত পূরণ করে ২০১৮ সালে।

আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক উত্থান-পতন লক্ষ করা যায়। রাজনীতির ইতিহাসে কিছু ঘটনা ঘুরে ঘুরে আসে। যদি বলা হয় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না। আমাদের দেশের রাজনীতি থেকে বঙ্গবন্ধুকে কোনো দিন মুছে ফেলা যাবে না; যদিও তাঁকে হেয়প্রতিপন্ন করার অনেক চেষ্টাই হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার রাজনীতিতে অভিষেক যেমন তাঁর জন্য সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না, তেমনি মসৃণ ছিল না তাঁর রাজনৈতিক চলার পথটিও। পায়ে পায়ে পাথর ঠেলে শেখ হাসিনাকে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। কিন্তু জনগণকে আস্থায় নিয়ে রাজনৈতিক কল্যাণের যে পথযাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর, তা থেকে তাঁকে বিচ্যুত করা যায়নি। ১৯৮১ থেকে এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাটি একেবারেই কুসুমাস্তীর্ণ বলা যাবে না, বরং কণ্টকাকীর্ণ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি। বাবার মতোই অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছেন। দীর্ঘদিন কাটাতে হয়েছে নিঃসঙ্গ পরবাসে। স্বামী-সন্তান নিয়েও গভীর বেদনার দিন পার করতে হয়েছে তাঁকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের অন্য সদস্যদের হারিয়েও স্বদেশে ফিরতে পারেননি তিনি। দেশের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পরও ছায়ার মতো তাঁকে অনুসরণ করেছে ঘাতক। একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে তিনি সংসদে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হন। বসেন বিরোধীদলীয় নেতার আসনে। জনস্বার্থে ১৯৮৮ সালে পদত্যাগ করলেন। এরপর যুগপৎ আন্দোলন-সংগ্রাম। তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে কয়েকবার—চট্টগ্রামে, কোটালীপাড়ায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলা করা হয়েছে। বাংলার মানুষের ভালোবাসার কাছে পরাজিত হয়েছে শত্রু। এর পরও ষড়যন্ত্র কম হয়নি তাঁকে নিয়ে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করাটাও ছিল গভীর এক ষড়যন্ত্র।

আজকের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে অনেক কালো অধ্যায় পার হয়ে আসতে হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার চলার পথটা মসৃণ ছিল না কোনো দিনই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৩ বছরে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে এক সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন। বাংলাদেশের স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আগামী ২৫ জুন। গত মার্চে শতভাগ বিদ্যুতের যুগে প্রবশে করেছে দেশ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পথ ধরে উন্নয়নের নতুন পথে শনৈঃ শনৈঃ এগিয়ে নিয়ে যেতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই—এই সত্য আজ প্রতিষ্ঠিত।

কিন্তু ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই। এখনো বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে চলতে হচ্ছে। দেশের মানুষের শতভাগ আস্থা তাঁরই প্রতি। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর এখন অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি দেশের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করেছেন নিজের বর্তমান। ব্যক্তিগতভাবে বর্তমানকে ভোগ করেন না তিনি। আর সে কারণেই বাঙালির সঙ্গে তাঁর জন্মান্তরের নিবিড় যোগসূত্র। দেশের মানুষের আস্থা ও অস্তিত্বে তাঁর স্থায়ী আসন।

আজ আমরা দেখতে পাই দেশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তৎপর। ঘাপটি মেরে আছে রাজনৈতিক অপশক্তিও। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উদারনৈতিক ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির সম্মিলিত প্রয়াস।

প্রকাশকাল: ১১ জুন ২০২২, কালের কণ্ঠ
লেখক : সর্বইউরোপীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *