কাজী নজরুল ইসলাম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • তাপস হালদার

বর্তমান সময়ে দেশে দেশে সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ, মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় কুসংস্কার ও ধর্মের নামে হানাহানি বেড়েই চলেছে। নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের দোহাই দিয়ে অন্য ধর্মানুসারীদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো এক ধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এসব থেকে মানুষকে মুক্ত রাখতে আজীবন যিনি সংগ্রাম করেছেন তিনি হলেন অসাম্প্রদায়িক ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কাজী নজরুল ইসলাম লেখালেখি শুরু করেন।তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর লেখনী গোটা ভারতবর্ষের মানুষকে প্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেন বিদ্রোহী কবি।অত্যাচার, অনাচার, নিপীড়ন, শোষণ, নির্যাতন, বৈষম্য ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে আপসহীন কবি লিখে গেছেন অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প, সংগীত, প্রবন্ধ, উপন্যাস। যার কারণে ইংরেজ সরকারের রোষাণলে পড়ে কারাভোগও করতে হয়েছে। সেখানেও তিনি মাথানত করেননি বরং টানা ৪০ দিন অনশন করে ব্রিটিশ সরকারের অন্যায়-অত্যাচার, জেল-জুলুম নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনিই প্রথম বাঙালি কবি যিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য কারাবরণ করেছেন।

বিশ্ব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কালজয়ী কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা প্রত্যেকেই মানবতার কথা বলেছেন। মধ্যযুগের বাঙালি কবি চণ্ডীদাস যেমন বলেছেন, ‘শুনহ মানুষ ভাই/সবার ওপরে মানুষ সত্য/তাহার ওপরে নাই’। তার পরবর্তীতে লালনও একই কথা বলেছেন, ‘মানুষ ধরো, মানুষ ভজো, মানুষ খোঁজো, শোন বলিরে পাগল মন।’ আর নজরুল ইসলাম তো আরও স্পষ্ট করে মানবতাবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান/নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি/সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’

কাজী নজরুল ইসলাম কোনও ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে দেখতেন না, সেটি ‘হিন্দু মুসলমান’ প্রবন্ধে আরো স্পষ্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘নদীর পাশ দিয়ে চলতে চলতে যখন দেখি, একটা লোক ডুবে মরছে, মনের চিরন্তন মানুষটি তখন এ-প্রশ্ন করবার অবসর দেয় না যে, লোকটা হিন্দু না মুসলমান। একজন মানুষ ডুবছে, এইটেই হয়ে ওঠে তার কাছে সবচেয়ে বড়, সে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীতে। হিন্দু যদি উদ্ধার করে দেখে লোকটা মুসলমান, বা মুসলমান যদি দেখে লোকটা হিন্দু, তার জন্য তো তার আত্মপ্রসাদ এতটুকু ক্ষুণ্ণ হয় না। তার মন বলে, ‘আমি একজন মানুষকে বাঁচিয়েছি, আমারই মতো একজন মানুষকে।’

এ বিষয়ে ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধে আরো বলেছেন, “মারো শালা যবনদের। মারো শালা কাফেরদের।-আবার হিন্দু-মুসলমানী কাণ্ড বাঁধিয়া গিয়াছে। প্রথম কথা কাটাকাটি, তারপর মাথা ফাটাফাটি আরম্ভ হইয়া গেল। আল্লার এবং মা কালীর ‘প্রেস্টিজ’ রক্ষার জন্য যাহারা এতক্ষণ মাতাল হইয়া চিৎকার করিতেছিল তাহারাই যখন মার খাইয়া পড়িয়া যাইতে লাগিল, দেখিলাম-তখন আর তাহারা আল্লা মিয়া বা কালী ঠাকুরাণীর নাম লইতেছে না। হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি পড়িয়া থাকিয়া এক ভাষায় আর্তনাদ করিতেছে- ‘বাবা গো, মা গো, -মাতৃ পরিত্যক্ত দুটি বিভিন্ন ধর্মের শিশু যেমন করিয়া এক স্বরে কাঁদিয়া তাহাদের মাকে ডাকে।”

কাজী নজরুল কৃষক-শ্রমিক, কুলী-মজুর, মাঝি-মাল্লা, সাঁওতাল-মনিপুরীসহ অসংখ্য শ্রেণির মানুষদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য গান, কবিতা লিখেছেন। কোনও বিশেষ গোষ্ঠীকে নিয়ে তিনি কোনও ভেদাভেদ করেননি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রতিটি পদক্ষেপে নজরুলের অমর সৃষ্টি গান কিংবা কবিতা বাঙালিদের উদ্দীপ্ত করতো। ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু, দুস্তর পারাপার হে/লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশিতে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার/দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছ মাঝিপথ-/ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত/–ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যার জীবনের জয়গান/আসি অলক্ষ্যে দাঁড়ায়েছে তারা, নিবে কোন বলিদান।’

গানগুলোর প্রতিটি চরণে অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ-নির্যাতনের প্রতিবাদে মানুষের মনে স্বাধিকারের দাবিতে জাগরণের সৃষ্টি হতো। মুক্তিযুদ্ধকালীন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নজরুলের গান গণসংগীত হিসেবে গাওয়া হতো- ‘কারার ঐ লৌহ কপাট/ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট রক্ত- জমাট, শিকল-পূজার পাষাণ বেদী/ওরে ও তরুণ ঈশান/বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ! ধ্বংস-নিশান/উঠুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি’।

নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রথম থেকেই হিন্দু-মুসলিম উভয় মৌলবাদীরা সহ্য করতে পারেনি। নজরুলের কবিতায় যখন শ্যামা সংগীত গেয়ে ভগবানের প্রশংসা করেছেন তখন মুসলমানরা ক্ষেপেছেন, আর যখন ইসলামী গজল গেয়ে আল্লাহর প্রশংসা করেছেন তখন হিন্দুরা ক্ষেপেছেন। তিনি ধর্মে ধর্মে, মানুষে মানুষে সম্প্রীতি সৃষ্টির জন্যই কবিতায়-গানে একই সঙ্গে আল্লাহ-ঈশ্বর, মসজিদ-মন্দির-গীর্জা, কোরআন-বেদ-বাইবেল-ত্রিপিটক প্রভৃতি ব্যবহার করেছেন।

নজরুল কোনও ধর্মের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করেননি। তিনি বিদ্রোহ করেছেন ধর্ম-ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। একদল ভন্ড পীর, হুজুর, গোশাই,পাদ্রি যারা ধর্মকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সুবিধা নিয়েছে, তিনি তাদের বিরুদ্ধেই সোচ্চার ছিলেন।

ব্যক্তি জীবনেও কাজী নজরুল সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ছিলেন। তিনি হিন্দু নারী প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করেছেন কিন্তু তিনি তাকে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেননি। উভয়ই নিজ নিজ ধর্ম বজায় রেখেই সংসার জীবন পালন করেছেন। সন্তানদের নাম রাখার ক্ষেত্রেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর প্রথম সন্তানের নাম রেখেছেন কাজী কৃষ্ণ মোহাম্মদ, দ্বিতীয় সন্তান কাজী অরিন্দম খালেদ, তৃতীয় কাজী সব্যসাচী এবং সর্বশেষ কাজী অনিরুদ্ধ। সে সময়ে এ ধরণের নাম রাখা রীতিমত একটা ঝুঁকি ছিল, কিন্তু তা জানা সত্ত্বেও তিনি কাজটি করেছিলেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পঞ্চাশের দশক থেকে পাকিস্তানী শাসকদের সাম্প্রদায়িকতা, অন্যায়, জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালিরা রুখে দাঁড়িয়েছিল। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন এবং চূড়ান্ত পরিণতিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, প্রতিটি পর্বেই নজরুলের বিদ্রোহী, অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন ঘটেছিল। মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের কবিতা-গান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে অসাম্প্রদায়িকতাকে স্থান দেওয়ার ক্ষেত্রে নজরুল সাহিত্যের বড় প্রভাব রয়েছে।

প্রচলিত অর্থে কবি নজরুলের কোনও নিজস্ব ধর্মীয় দর্শন ছিল না। তাঁকে যারা কোনও বিশেষ ধর্মের আবরণে আবদ্ধ করতে চেয়েছেন, তারা ভুল করেছেন। তিনি ছিলেন মুক্ত মানুষ, মুক্ত কবি। তিনি ছিলেন যুগ সন্ধিক্ষণের কবি। তিনি সমাজকে ভেঙে, নিজের মত করে গড়েছেন। তিনি মানবতার কবি, শৃঙ্খল মুক্তির কবি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কবি।

কাজী নজরুল ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র, অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর। সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে নজরুল সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ পরিচয়কেই সবচেয়ে বড় করে দেখেছেন। এ জন্যই তিনি তাঁর কবিতায় বলেছেন—
‘গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান। নাহি দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি, সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’

কবির শুভ জন্মদিনে তাঁকে জানাই প্রণতি ও বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

প্রকাশকাল: ২৫ মে ২০২২, সুখবর ডট কম।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.