ইমরান খানের আত্মসমর্পণ ও পাকিস্তানের রাজনীতি

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

ইমরান খান তাঁর আত্মীয় জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির পথেই হাঁটলেন। একাত্তরে নিয়াজি ঢাকায় ঘোষণা দেন, লাস্টম্যান, লাস্ট বুলেট পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ করবেন এবং ঢাকার পতন হতে পারে শুধু তাঁর মৃতদেহের ওপর দিয়ে। কিন্তু কোথায় রইল লাস্টম্যান, লাস্ট বুলেটের ঘোষণা। ৯৩ হাজার জীবিত সেনা নিয়ে ঢাকায় লাখো মানুষের সম্মুখে নিয়াজি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করলেন।

ইমরান খান রাজনৈতিক যুদ্ধে বিরোধীদের পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে একই রকম শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে, প্রয়োজনে শহীদ হওয়ার ঘোষণা দিয়ে শেষ মুহূর্তে এসে সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নিলেন। এটিই যদি করবেন, তাহলে সেটি আরো মাসখানেক আগে করতে পারতেন, তাতে নিজের রাজনৈতিক মর্যাদা রক্ষা পেত। এখন আম-ছালা দুটিই হারালেন বা হারাবেন। যদিও শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। পরিস্থিতি উত্তপ্ত। পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত মোর্চা পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) ৭ মার্চ ইমরান খান সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব সংসদে জমা দেয়। তখনই ক্ষণগণনা শুরু হয়ে যায়, আর কয় দিন আছে ইমরান খানের সরকার। পাকিস্তানের মিডিয়া ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সবাই বলেছেন, এবার আর ইমরান খানের রক্ষা হবে না। কারণ পাকিস্তান সরকারের হায়াত-মউতের মালিক সামরিক গোষ্ঠীতন্ত্র ঐতিহ্য ভাঙতে নারাজ।

গত ৭৫ বছরে পাকিস্তানের কোনো প্রধানমন্ত্রীই পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। বিশ্বব্যাপী এটি এখন সুবিদিত যে সেনাবাহিনীর হাতেই পাকিস্তানের ক্ষমতার রশি। মেয়াদপূর্তির আগেই প্রতিটি সরকারের পতন ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাচ্যুতি ঘটিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় ক্ষমতায় কোনোভাবে আসা গেলেও ক্ষমতায় থাকা ও বিদায় অন্য কারো হাতে নয়, সম্পূর্ণ সেনাবাহিনীর হাতে আছে এবং থাকবে। এবারও ব্যতিক্রম কিছু হয়নি।

ইমরান খান সরকারের মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। মুসলিম লীগ (নওয়াজ), পিপলস পার্টি (পিপিপি) ও অন্যান্য ইসলামিস্ট দলসহ ১১টি দল মিলে যখন পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম) গঠিত হলো এবং তার চেয়ারম্যান হলেন জামিয়াত-উলেমা-ই-ইসলামের মাওলানা ফজলুর রহমান, তখন পরিষ্কার হয়ে যায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক মঞ্চের চলমান পুতুলনাচের রশি কাদের হাতে এবং কী হতে চলেছে। এই মাওলানা সাহেব কট্টর দেওবন্দি চরম উগ্রবাদী ইসলামিস্ট মোল্লা। মোল্লা ও মিলিটারি আঁতাতের অন্যতম বাহক ও সেতুবন্ধ তিনি।

এর আগে বেনজির ভুট্টোকে দুইবার, নওয়াজ শরিফকে তিনবার ক্ষমতাচ্যুতিতে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ব্যবস্থাপনায় মাওলানা ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে কট্টর ইসলামিস্ট দলগুলো একত্র হয়ে রাস্তাঘাট বন্ধ এবং সব কিছু অচল করে দেওয়ার সূত্রেই বেনজির ও নওয়াজ সরকারের পতন ঘটেছে। ৭ মার্চ অনাস্থা প্রস্তাব সংসদে জমা পড়ার পর ইমরান খান ঘোষণা দিলেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না, অনাস্থা প্রস্তাবও পাস হতে দেবেন না, তাঁর কাছে চমক আছে। শেষ পর্যন্ত লড়াই করে তিনি গাজি হয়ে সরকারের বাকি দিন পুরো করবেন। এটি ছিল প্রভুর প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো। রবীন্দ্রনাথ পড়া থাকলে দুর্গেশ দুমরাজের কথা মনে পড়ত। দুর্গেশ দুমরাজের মতো বীরের পথ বেছে না নিয়ে কাপুরুষ আত্মীয় আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির পথই তিনি বেছে নিয়েছেন। ৩ এপ্রিল, রবিবার অনাস্থা প্রস্তাব ভোটে যাওয়ার আগমুহূর্তে নিজ দলের স্পিকার অনাস্থা প্রস্তাব বাতিল করে দেন। সঙ্গে সঙ্গে ইমরান খান সংসদ ভেঙে দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেছেন। বিরোধীদের চাহিদাই পূরণ হলো একটু ঘুরিয়ে। শত্রুর গুলিতে নির্ঘাত ধরাশায়ী হওয়ার আগমুহূর্তে লাজলজ্জা ঝেড়ে ফেলে তিনি আত্মসমর্পণ করলেন।

জাতীয় সংসদের মোট সদস্য ৩৪২ জন। অনাস্থা প্রস্তাব ঠেকাতে প্রয়োজন ১৭২ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন। ইমরানের নিজ দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সদস্যসংখ্যা ১৫৫। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর কিছু খুচরা দলের সমর্থন নিয়ে ইমরান খান সরকার গঠন করেন। এর মধ্য দিয়ে তুরুপের তাস মিলিটারির হাতে রয়ে যায়। ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দলীয় আসনপ্রাপ্তির বিন্যাস দেখে তখনই বোঝা গেছে, পাকিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সেনাবাহিনী ক্ষমতার রশি নিজেদের হাতে রাখার জন্য সব কিছু অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সাজিয়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি সরাসরি সামরিক শাসনের অনুকূলে নয় বিধায় সরকারের কায়ায় থাকতে না পারলেও পরোক্ষভাবে সেনা কর্তৃত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলভিত্তিক আসনপ্রাপ্তি দেখলেই সেটি বোঝা যায়।

ভুট্টো পরিবার নিয়ন্ত্রিত পিপলস পার্টি ও তখন সদ্য বিদায় হওয়া নওয়াজ শরিফের মুসলিম লীগ, দুই দল মিলে যে আসন পায় তার থেকে এককভাবে বেশি আসন পায় সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। নির্বাচনের ফলাফলের সমীকরণটি তখন এমন হয় যে মেয়াদপূর্তির আগেই সেনাবাহিনীর অদৃশ্য ইশারায় যথাক্রমে দুইবার ও তিনবার ক্ষমতাচ্যুত পিপলস পার্টি ও মুসলিম লীগ একজোট হয়েও যাতে সরকার গঠন করতে না পারে, তা নিশ্চিত হয়। অন্যদিকে ইমরান খানের জন্য সরকার গঠন ও তা টিকিয়ে রাখতে স্বতন্ত্র এবং খুচরা দলের সংসদ সদস্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে।

একটু পেছনের কথা বলা যাক। স্বয়ং খোদার সঙ্গে দৈনিক পাঁচবার সরাসরি সংযোগ স্থাপন হয় বলে দাবিদার তখনকার তথ্য ও প্রচার মন্ত্রী মেজর জেনারেল শের আলী খান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ রকম একটি ব্যবস্থা করবেন বলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু দৈব ক্ষমতার দাবিদার দেববাণী সেদিন সত্য হয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলোর আসনপ্রাপ্তিতে সেনা গোয়েন্দা সংস্থার হাত থাকায় সংগত কারণেই ক্ষমতার নাটাই থেকে যায় সেনাবাহিনীর হাতে। সুতরাং বিগত কিছুদিন যেসব নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে এবং শেষমেশ ৩ এপ্রিল রবিবার ইমরান খানের আত্মসমর্পণ অর্থাৎ সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যা যা ঘটেছে, এটি একদিকে যেমন নতুন কিছু নয়, তেমনি হঠাৎ করে কিছু হয়নি। সাজানো ছকের মধ্যে সব কিছু হয়েছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সবাই বলে আসছেন ইমরান খান ইলেকটেড নন, সিলেকটেড প্রধানমন্ত্রী, অর্থাৎ সেনাবাহিনীর পছন্দেই তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। তাই সবাই আলোচনা করছেন কী ঘটেছে, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। ইমরান খান সফল ক্রিকেট দলনেতা ছিলেন। তাঁর একটা জনপ্রিয়তা আছে। এটাকে সেনা কর্তৃপক্ষ কাজে লাগাতে চেয়েছে। তাই পিপলস পার্টি ও মুসলিম লীগের (নওয়াজ) বিকল্প হিসেবে ইমরান খানকে সামনে আনা হয়। একসময় পিপলস পার্টির বিকল্প হিসেবে ধনাঢ্য শিল্পপতি পরিবারের সন্তান নওয়াজ শরিফকে তৈরি করেছিলেন সেনাশাসক জিয়াউল হক। নওয়াজ শরিফ রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়ে নিজস্ব চিন্তায় চলতে চাওয়ায় অদৃশ্য শক্তির কোপানলে পড়েন।

ইমরান খানের বেলায়ও সেটিই ঘটেছে। ক্রিকেট খেলা আর রাজনীতি এক নয়। মোল্লা ও মিলিটারি নিয়ন্ত্রিত এবং পারমাণবিক বোমার অধিকারী রাষ্ট্রের রাজনীতি অত্যন্ত কঠিন কাজ। তিনি অতীত রাজনীতি থেকে শিক্ষা নেননি। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বৈশ্বিক শক্তিবলয়ের অবস্থান ও তার সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সম্পর্কের সমীকরণ তিনি বুঝতে ভুল করেছেন। বলা যায়, এ ক্ষেত্রে চরম অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন।

২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া আন্তর্জাতিক বিধান ও কনভেনশন ভঙ্গ করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই দিনই ইমরান খান রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে মস্কোতে পুতিনের সঙ্গে ছবিতে পোজ দিয়েছেন। মস্কোতে যাওয়ার কয়েক দিন আগে রাশিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন আরটিভির একজন স্মার্ট তরুণী সাংবাদিক পাকিস্তানে এসে ইমরান খানের সাক্ষাৎকার নেন। অনেক কিছুর মধ্যে অত্যন্ত সাধারণ একটি প্রশ্ন করেন। জিজ্ঞেস করেন, মস্কোতে গিয়ে পুতিনকে আপনি কী বলবেন। উত্তরে ইমরান খান বলেন, তিনি পুতিনকে বলবেন, পাকিস্তান কোনো পরাশক্তির দাসত্ব আর করবে না, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে।

কথাটি আপাতদৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে, ঠিকই তো আছে। কিন্তু রাজনীতি ও কূটনীতির ভাষা এটি নয়। দ্বিতীয়ত, তিনি সেনাবাহিনীর রেডলাইন অতিক্রম করে নিজেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তির শিকার হয়েছেন। ক্ষমতাশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সদ্য সাবেক চিফ জেনারেল ফাইজ হামিদকে ইমরান খান ওই একই পদে আরো কিছুদিন রাখতে চেয়েছিলেন এবং পরে তাঁকে সেনাপ্রধান করবেন—এ রকম পরিকল্পনার কথা ফাঁস হয়ে যায়। এটি নিয়েই সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার সঙ্গে ইমরান খানের দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যায়।

১৯৯৯ সালে নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে না জানিয়ে অন্য জেনারেলকে সেনাপ্রধান করতে চেয়েছিলেন বলেই শুধু ক্ষমতাচ্যুত নন, অল্পের জন্য সৌদি আরবের বদৌলতে ফাঁসির রশি থেকে বেঁচে গেছেন। প্রয়াত বেনজির ভুট্টো প্রায় একই রকম কারণে দুইবার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। ইমরান খান ম্যাকিয়াভেলির ‘দ্য প্রিন্স’ বইটি পড়েছেন কি না জানি না। পড়ে থাকলে এত বড় ভুল তিনি কী করে করলেন! ভুলের খেসারত তো দিতেই হবে। সুতরাং যা হওয়ার সেটিই হয়েছে। তাই ইমরান খানকে যেতে হবে, কিন্তু বিগত দিনের ইতিহাস ভালো নয়। বেনজির ও নওয়াজ—দেশ ছেড়ে একজন বেঁচেছেন, আরেকজন বাঁচতে পারেননি।

বড় কঠিন পাকিস্তানের রাজনীতি। পাকিস্তানের অর্থনীতি গত কয়েক বছরে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে, যার জন্য সবাই ইমরান খানকে দায়ী করছেন। তবে আমি মনে করি, এটি অজুহাত মাত্র। মূল কারণ অন্য কিছু, যার দু-একটি উল্লেখ করলাম। তিনি প্রভুর বিরাগভাজন হয়েছেন। লেখা শেষ করার পর্যায়ে খবর পেলাম প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের অনুরোধে প্রেসিডেন্ট রবিবারই সংসদ ভেঙে দিয়েছেন। তবে বিরোধীপক্ষ ইমরান খানকে সহজে ছাড়তে চাইছে না। তারা বলছে, স্পিকার অনাস্থা প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বেআইনি কাজ করেছেন। তারা উচ্চ আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইমরান খানের শেষ পরিণতি কী হবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও আগামী নতুন নির্বাচন সম্পর্কে জানতে আরো কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে অস্থিতিশীল, অগণতান্ত্রিক এবং মোল্লা ও মিলিটারিতন্ত্রের পাকিস্তান বাংলাদেশসহ সমগ্র উপমহাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। পাকিস্তান যেদিকেই যাচ্ছে, এর পরিণতিতে ভারতের অভ্যন্তরে জঙ্গি তৎপরতার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাওয়াসহ সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

 

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক, যুগ্ম-আহ্বায়ক, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

প্রকাশকাল: ৫ এপ্রিল, ২০২২। কালের কণ্ঠ।

 


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.