আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

গত ৩০ এপ্রিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার সমাপ্তি ঘটল গাফফার ভাইকে দেখতে যাওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র পেয়ে। লন্ডন পুলিশ সব সময়ই আমাকে একা না বেরোনোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন, কেননা সেখানে খুনি তারেক জিয়ার মাস্তান বাহিনীর যারা টার্গেটে আমি তাদের অন্যতম। অতীতে তারেকের মাস্তানরা আমাকে দুই দফা আক্রমণ করেছিল। তাই আমার ছাত্র সলিসিটার মেহেদি হাসানকে নিয়ে বেরুলুম বহু দূরে অবস্থিত বার্নেট হাসপাতালের পথে। পৌঁছে দেখি গাফফার ভাই জাগ্রত, কিন্তু চোখ বুজে যেন কী ভাবছেন। চোখ খোলার পর শুভ সন্ধ্যা জানিয়ে বললেন, চোখ বন্ধ করে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানটি মনে মনে গাইতে ছিলাম- যে গানটির প্রথম লাইনগুলো ছিল “আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে, পান্থ পাখির কুজন কাকলি ঘিরে, আগামী পৃথিবী কান পেতে তুমি শোন, আমি যদি আর নাই আসি হেথা ফিরে।” কিংবদন্তি দুজন গীতিকার গৌর প্রসন্ন মজুমদার এবং নচিকেতা ঘোষের লেখা গানটি প্রবাদপ্রতিম সংগীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের যৌবনকালে গাওয়া গান হলেও এ গানটিই ছিল তার গাওয়া শেষ গান ও আর সেটি তিনি গেয়েছিলেন ১৯৮৯ সালে তার প্রয়াণের কিছুদিন আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনে।

এরপর গাফফার ভাই জিজ্ঞেস করলেন তার লেখা একুশের গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানটি কি আগামী পৃথিবী কান পেতে শুনবে? আমার জবাব ছিল যতদিন এ পৃথিবীতে সূর্যোদয় ঘটবে, যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে আপনার সেই কালজয়ী চির অমর গানের স্বরলিপিও ততদিন লেখা রবে পান্থ পাখিদের কূজন কাকলি ঘিরে। আর সেই সঙ্গে আপনার স্মৃতিও চির জাগ্রত থাকবে পৃথিবীর সব বাঙালির মনে। কথাটি শুনেই গাফফার ভাইয়ের চোখ থেকে পানির ঢল নামল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নার্স এসে বললেন গাফফার ভাইকে এমন কিছু না বলার জন্য যাতে তিনি আবেগময় হয়ে পড়েন। মাত্র কদিন আগেই তার তৃতীয় কন্যা বিনোতা চৌধুরী বহুদিন ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করে অবশেষে অসময়ে ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। মেয়ের এ অকাল মৃত্যু গাফফার ভাইকে মারাত্মকভাবে মর্মাহত করেছে। বলতে গেলে এর পর থেকে তার চোখের পানি আর বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকার জন্য তার লেখাও বন্ধ হয়ে যায়। এর পর পর তার বহু যুগের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাহেবের মৃত্যুও তার কাছে আরও এক অসহনীয় আঘাত হিসেবেই হাজির হয়। গাফফার ভাইয়ের মধ্যে অতীতে যে সাহস, উদ্দীপনা দেখতাম, তা যেন অনেকাংশেই ম্লান হয়ে গেছে, তার কন্যার অকাল মৃত্যুর কারণে। তবুও তিনি পুরনো স্মৃতি টেনে এনে অনেক কথা বললেন।

মনে করিয়ে দিলেন ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর গোটা বিশ্বে তিনিই প্রতিবাদী কণ্ঠ হিসেবে প্রথম প্রকাশ করেছিলেন ‘বাংলার ডাক’ নামে এক পত্রিকা, বঙ্গবন্ধু গবেষক, বিশিষ্ট লেখক প্রয়াত আবদুল মতিন এবং এম আর আখতার মুকুলের সহায়তায়। গাফফার ভাই আবার জোর দিয়ে বললেন, আমার প্রয়াত স্ত্রী লায়লা চৌধুরী হাসির টাইপিং সহায়তা ছাড়া, বাংলার ডাক প্রকাশ করা তার পক্ষে সম্ভব হতো না। সেই পত্রিকায় তিনি সে বছরই লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল চাবিকাঠি নেড়েছিল খুনি জিয়াউর রহমান, যে দাবিটি পরে সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশে মৌলবাদ এবং ধর্মান্ধতার উত্থান যে তাকে মারাত্মকভাবে শঙ্কিত করে তুলেছে তা তিনি বারবার প্রকাশ করে বলছিলেন, বঙ্গবন্ধু ধর্মান্ধতা এবং ধর্মের নামে ব্যবসাকে সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, কিন্তু জিয়া গং তাকে হত্যা করে পাকিস্তানি প্রভুদের প্রেরণা পেয়ে দেশে আবার ধর্মান্ধতা এবং ধর্মীয় রাজনীতি ফিরিয়ে এনেছে, যাকে পরবর্তীতে জ্বালানি দিয়ে জীবিত রেখেছে জিয়ার স্ত্রী খালেদা। প্রশ্ন করলেন এ ধর্ম ব্যবসায়ী অপশক্তিকে পরাস্ত করা কতটা সম্ভব? জানতে চাইলেন হেলিকপ্টারে চড়ে, কোটি কোটি টাকা অনৈসলামিক পন্থায় নিরীহ মানুষদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে যেসব ওয়াজ ব্যবসায়ী ধর্মের নামে ঘৃণার বাণী ছড়াচ্ছে, অন্য ধর্মের লোকদের বিরুদ্ধে কথা বলে সম্প্রীতির পরিবেশ ধ্বংস করছে, নারীদের কর্মে যোগদানের বিরুদ্ধে কথা বলে দেশের ধ্বংস ডেকে আনার পাঁয়তারা করছে, আর দেশকে তালেবানি রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে, সেই ওয়াজগুলো কেন বন্ধ করা হচ্ছে না, কেন এসব ওয়াজ ব্যবসায়ীদের বিচারে তোলা হচ্ছে না। তিনি বললেন টাকা চেয়ে ইসলামের জন্য ভাষণ দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম, অথচ এসব ওয়াজ ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকা দাবি করে, হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে ওয়াজের নামে প্রতিনিয়ত পাপ কাজটিই করে যাচ্ছে। আয়কর না দিয়ে, ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ওয়াজের ব্যবসা করে তারা রাষ্ট্রের আইনও ভঙ্গ করছে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে গাফফার ভাই পড়াশোনা শুরু করেছিলেন মাদরাসার ছাত্র হিসেবে, তাই ইসলাম ধর্মের ওপর তার জ্ঞানে ঘাটতি আছে তা বলা যাবে না। তাই ওয়াজ ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তিনি যা বললেন তা বিশ্বাস করতেই হয়। তিনি বললেন, ধর্ম পালন করা এক জিনিস আর ধর্মের নামে পয়সা উপার্জন করা অন্য জিনিস, যাকে ধর্ম ব্যবসা ছাড়া অন্য কিছু বলা যায় না। তিনি বলেন, বাংলার মানুষ ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। তারা এসব ওয়াজ ব্যবসায়ীকে ঠিকই চিনে। কিন্তু অবসর সময়ে বিনোদনের অন্য কোনো পথ, যথা যাত্রা, নাটক ইত্যাদি খোলা না থাকায় তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই এসব ওয়াজ ব্যবসায়ীর অনুষ্ঠানে যায়। আরেক ওয়াজ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান আজহারিকে বিলেতে ঢোকার পথ বন্ধ করার জন্য বিলেতের হাই কোর্টে মামলা করে যারা সফল হয়েছিলেন, যথা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা আনসার আহম্মদউল্লা, জামাল খান, স্নিগ্ধা, নূর, মুজিব প্রমুখের প্রশংসা করে তিনি বললেন তারা একটি গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অধ্যাপক ড. লতা সমাদ্দার, হৃদয় মন্ডল, আমুদিনি, ঝুমন দাস, মনোরঞ্জন দাস প্রমুখদের ওপর ধর্মান্ধদের আক্রমণের কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন প্রশাসন, পুলিশ এবং এমনকি নিম্ন আদালতগুলোতে এত ধর্মান্ধের অনুপ্রবেশ কীভাবে ঘটল? তিনি আরও বললেন এরা যে দন্ডবিধির ২৯৫ ক ধারায় এদেশ থেকে হিন্দু তাড়ানোর জন্য অপপ্রয়োগ করছে সেটা অনেকটাই পরিষ্কার, ২০০১-এর নির্বাচনের পরে যেমনটি করেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার, যখন হাজার হাজার হিন্দুকে এ দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। আমরা ১৫ জনের একটি শক্তিশালী দল যে হৃদয় মন্ডলের সমর্থনে মুন্সীগঞ্জ গিয়ে ধর্মান্ধদের সতর্ক করে দিয়েছিলাম, গাফফার ভাই তাও জেনেছিলেন এবং এ কারণে আমাদের অভিনন্দনও জানালেন। তিনি জানতে চাইলেন বাংলাদেশে এত হিজাব পরিহিত মহিলার আবির্ভাব কীভাবে ঘটল? এটা তো কখনো আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল না? বললেন আমাদের দাদি-নানিরা তো পর্দা করতেন মাথায় ঘোমটা দিয়ে, তারা তো হিজাব-টিজাব চিনতেন না। আরও বললেন হিজাব দিয়ে মোটেও পর্দা হয় না। তিনি উল্লেখ করেন এর পেছনে আন্তর্জাতিক মৌলবাদী গোষ্ঠীসমূহের যেমন প্রত্যক্ষ মদদ এবং অর্থায়ন রয়েছে, তেমনি রয়েছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর ভূমিকা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন ঢাকার পাকিস্তানি দূতাবাসের বহু অপকর্ম হাতেনাতে ধরা পড়ার পরেও কেন এ দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে না? ধর্মান্ধদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সমরে নামার জন্য তিনি শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুন, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডা. মামুন মাহতাব স্বপ্নীল, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলি সিকদার, আবেদ খান, স্বদেশ রায়, রাশেদ খান মেনন, বাদশা, এরোমা দত্ত প্রমুখের নাম উল্লেখ করে প্রশংসা করলেন। বললেন, ৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যে গুরুদায়িত্ব পালন করছে, তার ইতিবাচক ফল অবশ্যই ঘটবে। তিনি এটা বুঝতে অক্ষম মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া সরকার কেন মৌলবাদীদের সঙ্গে আপসের পথ বেছে নিয়েছে। এদের এখনই কঠোর হাতে সমূলে ধ্বংস না করলে এরা তো জিয়াউর রহমানের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে দেশকে পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা করবে। তিনি বারবার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ রক্ষায় শেখ হাসিনার বিকল্প নেই, তাই তার হাতকে শক্তিশালী করতেই হবে। যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দিয়েছিলাম বলে, জিয়াউর রহমানকে ঠান্ডা মাথার খুনি হিসেবে চিহ্নিত করে রায় দিয়েছিলাম বলে গাফফার ভাই বললেন, এসব কথা ইতিহাস থেকে মুছে যাবে না। তিনি বলেন, লন্ডনের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে জিয়ার খুনি পুত্র তারেক রহমান পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল বুনে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সৈয়দ মোজাম্মেল আলির সার্থক ভূমিকার কথাও মনে করিয়ে দেন। নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে তাকে ততটা চিন্তিত মনে হলো না, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গাফফার ভাইয়ের উৎকণ্ঠা তার চেয়েও অনেক বেশি বলে মনে হলো। তার দুটি বৃক্কই সম্পূর্ণ অচল হয়ে গেছে বলে ডায়ালাইসিস সম্ভব নয়। বিভিন্ন কারণে বৃক্ক প্রতিস্থাপনও চলবে না। তাই ইনজেকশনের সাহায্যেই তাকে বেঁচে থাকতে হবে। সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা হাসনাত হাসান, আবু তাহের সিংকাপুনি এবং আরও কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধীদের নিয়ে হাউস অব কমন্সে রুম ভাড়া করে, ড. জাফরুল্লাহ এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য সরকারি স্বীকৃতি পায়নি এমন কয়েক ব্যক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা প্রদানের নামে যে নাটক ঘটাল, গাফফার ভাই সেটিকেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ বলে উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, হাসনাত সাহেবের (যিনি নিজে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না) সঙ্গে যারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী পরিচিত মুখ, যথা শামসুল আলম লিটন নামক বিএনপি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের অতিরিক্ত প্রেস সচিব। তাছাড়া আবু তাহের সিংকাপুনি তো স্বীকৃতভাবেই জামায়াতি পত্রিকা ‘দাওয়াত’-এর সম্পাদক ছিলেন, যে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিল বিলেতে পালিয়ে থাকা যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মইনউদ্দিন। আবু তাহের সিংকাপুনি পাঁচ হাজার যোদ্ধা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছে বলে যে দাবি করেছে, গাফফার ভাই তাকে হেলোসিয়েশন বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনটি হলে তো তার বীরপ্রতীক খেতাব পাওয়ার কথা, অথচ তার নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটেও স্থান পায়নি। গাফফার ভাই বললেন, আবু তাহের সিংকাপুনি যাকে সাক্ষী রেখেছেন, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সেই প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত গিয়াস উদ্দিন সাহেব নির্দ্বিধায় বলেছেন আবু তাহের সিংকাপুনির পুরো পরিবারই জামায়াতি আদর্শের প্রতি অনুগত। অনেকক্ষণ কথা বলার পর নার্স জানালেন এখন বিদায় নিতে হবে, তাই প্রস্থান। কিন্তু প্রস্থানের আগে বললেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকারকে কেউ উৎখাত করতে পারবে না। এর দুই দিন পরেই আমার ¯ন্ডেœহধন্য ছোট বোন সম হাইকমিশনার সাঈদা মুনা তাছনিম ফোন করে জানালেন তার বাসভবনে তিনি গাফফার ভাইয়ের সদ্য প্রয়াত মেয়ে বিনোতা চৌধুরীর স্মৃতির সম্মানে একটি অনুষ্ঠান করবেন। এতে অংশগ্রহণকারীগণ গাফফার ভাইয়ের পরিবারের সদস্য এবং তাদের ঘনিষ্ঠজনদের জন্য হলেও হাইকমিশনার মহোদয়া দুজন বাইরের লোককে আমন্ত্রণ করেছেন, যার একজন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ প্রধান সুলতান শরিফ, আর অন্যজন আমি। হাইকমিশনার মহোদয়া গাড়ি পাঠিয়েছিলেন আমার যাত্রার জন্য। সেখানে উপস্থিত দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ বিনোতার বিষয়ে ভাষণদানকালে গাফফার ভাইয়ের জীবনী এবং বাঙালি জাতির অভিভাবক হিসেবে তার কথা উল্লেখ করে বলেন, তাকে সারা পৃথিবীর বাঙালি জনগোষ্ঠী তাদের বিবেক বলে মনে করেন, যিনি তার একুশের অবিস্মরণীয় গানের জন্য অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্মৃতির জগতে। হাইকমিশনারও গাফফার ভাইকে একজন আলোর দিশারী, বাতিঘর বলে উল্লেখ করেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা করে, বিশেষ ধরনের গাড়ি ব্যবহার করে গাফফার ভাইকে হাইকমিশনারের বাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এ অনুষ্ঠানটি করে যুক্তরাজ্যে আমাদের হাইকমিশনার যে মহৎ কাজটি করেছেন তার জন্য তিনি নিশ্চয়ই সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার। তিনি নিজেও বিশেষভাবে উদ্যোগী ছিলেন, যার আরেকটি কারণ ছিল এই যে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত সব কূটনীতিক তাকে ভোট দিয়ে বছরের সেরা কূটনীতিক হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। গাফফার ভাইয়ের সঙ্গে হাসপাতালে তোলা ছবিটি ঢাকায় অনেককেই পাঠিয়েছিলাম। ছবি দেখার পর ভারতের বিখ্যাত সাংবাদিক, স্টেটম্যান পত্রিকার সাবেক সম্পাদক, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননাপ্রাপ্ত শ্রী মানস ঘোষ আমাকে জানালেন এ ছবি দেখে অধ্যাপক মুনতাসির মামুন অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। গাফফার ভাইয়ের সঙ্গে যারা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করছেন, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সহসভাপতি সৈয়দ মোজাম্মেল আলি তাদের অন্যতম, আর তাই গাফফার ভাইয়ের স্মৃতিচারণে তার কথা বিশেষ স্থান পেয়েছিল। হাইকমিশনের বাড়িতেই ছিল তার সঙ্গে এবারের শেষ দেখা। বিদায় নেওয়ার সময় গাফফার ভাই কবিগুরুর একটি কবিতার দুটি লাইন আবৃত্তি করলেন, যা ছিল ‘যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই, যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।’ তার এই আবৃত্তি শুনে কান্না থামাতে পারিনি। তবে নিজের মধ্যে বিশ্বাস আনার জন্য মনে মনে মান্না দের সেই বিখ্যাত গানের কথা মনে করে ভাবলাম, এ দেখাই যেন শেষ দেখা না হয়। আশা করব গাফফার ভাই অচিরেই ঢাকা আসতে পারবেন। এই মুহূর্তে তার বড় ইচ্ছা আত্মজীবনী লেখা। তার আগ পর্যন্ত পত্রপত্রিকায় আর লেখার ইচ্ছা তার নেই। ঢাকায় ফেরার পর অধ্যাপক মুনতাসির মামুন, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বদেশ রায়, ভারতের মানস ঘোষ, রাশেদ খান মেননসহ বহুজন জিজ্ঞেস করলেন গাফফার চৌধুরী সাহেব কেমন আছেন। তাদের বলতে পারিনি ‘তিনি ভালো আছেন’, কেননা তা হতো সত্যের অপলাপ। সবাই এক বাক্যে বললেন, এই মুহূর্তটায় গাফফার সাহেবের প্রয়োজন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। আরও বললেন, তার প্রস্থানের পর যে শূন্যতা সৃষ্টি হবে, তা পূরণ হওয়ার নয়। গত অর্ধশতক ধরে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে যেভাবে শব্দযুদ্ধ চালিয়েছেন, তা কি অন্য কেউ পারবে? সবাই আশা করছেন তিনি ভালো হয়ে যাবেন, ঢাকায় বেড়াতে আসবেন। আশা করি তাদের সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হবে। জয়তু গাফফার ভাই।

লেখক: আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি।
প্রকাশকাল: ১৬ মে, ২০২২, বাংলাদেশ প্রতিদিন।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.