অবরুদ্ধ হয় গণতন্ত্র, সেদিন কেঁদেছিল বাংলাদেশ

প্রবন্ধ পাতা
শেয়ার করুন

  • মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ

 

স্বাধীনতার মহান স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, গণতন্ত্রের কাণ্ডারি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে রাজধানীর ধানমন্ডির সুধাসদনের বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। এ গ্রেফতার ছিল সম্পূর্ণ প্রহসনের এবং এক নীলনকশা প্রণয়নের জন্য জাতিকে বিভ্রান্ত করার এক মহাষড়যন্ত্র। জনগণের কণ্ঠস্বর রোধ করে দেয়ার এবং জনগণের অধিকারহরণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকেই অবরুদ্ধ করে।

গণতন্ত্রের মানসকন্যা শেখ হাসিনার প্রতি এ অন্যায়, এ মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে নেতাকর্মীসহ দেশের মানুষ গর্জে ওঠে। আবেগে কেঁদে ফেলে গণতন্ত্রকামী প্রগতিশীল ছাত্র-জনতা। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর, প্রহসনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পরপরই দেশে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিএনপি নেতাকর্মীরা দেশব্যাপী হত্যা, লুণ্ঠন, লুটতরাজ, নিপীড়নের নারকীয় উৎসব শুরু করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নাভিশ্বাস ওঠে জনগণের। এক স্বপ্নহীন, নৈরাশ্যের যুগের সূচনা হয় দেশে।

বিএনপি সরকার দেশকে একটি জঙ্গিরাষ্ট্র, একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলে। সে সময়ই বাংলা ভাইয়ের মতো জঙ্গির উত্থান হয়। কিন্তু যতদিন জনগণের কণ্ঠস্বর, গণতন্ত্রের প্রতীক শেখ হাসিনা বাংলাদেশে থাকবেন ততদিন দেশকে পাকিস্তান বানানোর সে স্বপ্ন ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বপ্ন সফল হবে না বুঝতে পেরে বিএনপি-জামায়াত গণতন্ত্রের সুরক্ষা কবচ শেখ হাসিনাকে হত্যার নীলনকশা তৈরি করে। এ উদ্দেশ্যে তারা ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের এক জনসভায় গ্রেনেড হামলা করে। এ হামলায় নিহত হন ২৪ জন। তবে সৌভাগ্যজনকভাবে বেঁচে যান শেখ হাসিনা।

এরপর ২০০৬ সালের ৬ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হবার পর তৎকালীন বিএনপি সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে টালবাহানা শুরু করে। দেশে এক অনিশ্চয়তার পরিস্থিতির সূচনা হলে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সারাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে বিএনপি মনোনীত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে রাজনীতিতে কোণঠাসা করে বিএনপির নিজেদের লোকদের ক্ষমতায় বসানোর পথ সুগম করা।

এই অগণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর একমাত্র শেখ হাসিনাই বারবার দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন। একমাত্র শেখ হাসিনাই গণতন্ত্রের দাবিতে, জনগণের ভোটের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। ফলে তাঁকে স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের জন্য ঝুঁকি মনে করতে থাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ কারণের ক্ষমতায় আসার মাত্র ৬ মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

ষড়যন্ত্র ও গ্রেফতার আঁচ করতে পেরে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখেন। চিঠিতে শেখ হাসিনা দেশবাসীর প্রতি তাঁর আস্থার কথা যেমন ব্যাক্ত করেন তেমনি গণতন্ত্রের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের করণীয় কী তাও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। চিঠিতে তিনি যা লিখেন তার উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, “সত্যের জয় হবে, আমি আছি- আপনাদের সাথে, আমৃত্যু থাকব। আমার ভাগ্যে যা ঘটুক না কেন! আপনারা বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। জয় জনগণের হবেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তেই হবে। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটবেই। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” ।

দেশ ও জাতির সংকটময় মুহূর্তে এই চিঠিটি গণতন্ত্রকামী মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার করে। উজ্জীবিত হয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ হাসিনার চিঠি একটি অমূল্য দলিল। এই চিঠির ভাষাই প্রমাণ করে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি।

কিন্তু সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। উত্তাল আন্দোলন ও শেখ হাসিনার প্রতি দেশবাসীর অকুণ্ঠ সমর্থন ও অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে তৎকালীন অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। কারামুক্তির পর প্রথমেই তিনি ভিশন-২০২১ প্রকাশ করেছেন যা জনগণ সাদরে গ্রহণ করে। ফলে ২০০৮ এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জনতা নিরঙ্কুশ রায় দেয় শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের পক্ষে।

নির্বাচনে এই বিজয় লাভই প্রমাণ করে শেখ হাসিনা জনতার মধ্যে কতটা জনপ্রিয় এবং তাঁকেই মানুষ নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সারথি হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। শেখ হাসিনা বর্তমানে পরপর তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সঠিক পরিকল্পনায় এই বাংলাদেশকে অদম্য অগ্রযাত্রায় উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে দিয়েছেন। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ইত্যাদি মেগাপ্রকল্পসহ বাংলাদেশে সর্বত্র আজ উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। তিনি অসীম সাহস, ধৈর্য, দূরদৃষ্টি, প্রজ্ঞাময় পরিকল্পনা, সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে পরম মমতা ও কঠিন দৃঢ়তায় দেশ পরিচালনা করছেন। তিনি উদারতায় আকাশ সমান।

মানবতায় মাতৃসম, সুশাসনে ইস্পাত কঠিন। স্বদেশ ও স্বজাতির উন্নয়নই যার একমাত্র ভাবনা তিনি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানবতার নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা । তিনি এদেশকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করেছেন। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ এবং ১০০ বছর মেয়াদি ডেল্টা প্লান করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি ২৯ জুন ২০২০ তারিখে ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নের জন্য ১২ সদস্যবিশিষ্ট কাউন্সিলও গঠন করেছেন। গ্রেফতার, নির্যাতন ও ষড়যন্ত্র দিয়ে গণতন্ত্রের মানসকন্যাকে অবরুদ্ধ করা যায় নাই এবং যাবেও না। সকল দুর্যোগে তিনি আস্থার প্রতীক, ভরসাস্থল। প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

 

লেখক : সাবেক তথ্য এবং সংস্কৃতি সচিব।

প্রকাশকাল: ১৬ জুলাই ২০২০। জাগোনিউজ ।


শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published.